জ্বালানি লোডশেডিং ধাক্কায় পতনে পুঁজিবাজার 

বিদায়ী সপ্তাহে (রবিবার ও বৃহস্পতিবার) ;পুঁজিবাজারের মূলধন পরিমাণ আগের সপ্তাহের চেয়ে কমেছে। গেল সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূলধন কমেছে ১২ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। অপর পুঁজিবাজার চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) মূলধন কমেছে ১৩ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। গেল সপ্তাহে উভয় স্টকের ৮৫ ভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট দর পতন হয়। এর মধ্যে ডিএসইর ৮৪ ভাগ এবং সিএসইর ৮৭ ভাগ কোম্পানির দর পতন হয়। এসময় দুই স্টকের (ডিএসই ও সিএসই) সব ধরনের সূচক পতন হয়। এসময় সব মিলিয়ে গেল সপ্তাহে পুঁজিবাজারের গতি নেতিবাচক রুপে ছিল।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের ধাক্কা পড়েছে পুঁজিবাজারে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং ঘোষণার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এই পুঁজিবাজারে। এসব কারণে বড় ধরনের দরপতন হয় পুঁজিবাজারে। আরও বলেন, লোডশেডিং ঘোষণার দিন গত সোমবার ডিএসইতে বড় পতন শুরু হয়। সেই পতন আরো বড় আকারে দেখা দেয় পরের দিন গত মঙ্গলবার। ওই দুইদিনের তুলনায় পরে দুইদিনের (বুধবার ও বৃহস্পতিবার) পতন আকার কিছুটা ছোট হয়ে আসে।

চলতি বছরের শুরুর দিকের উত্থানে সবাইকে পুঁজিবাজারে প্রতি বিনিয়োগ আগ্রহী করে তুলেছিল জানিয়ে বিজ্ঞ বিনিয়োগকারীরা বলেন, সেই আগ্রহে অনেকে নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করেছিল। ধারাবাহিক মন্দায় সেই নতুন বিনিয়োগ কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঈদের আগের শেষ সপ্তাহে সবুজ সিগন্যাল থাকলে ঈদের পর দুই সপ্তাহে রয়েছে তার উল্টো গতিতে। অবশ্য এর মধ্যে গেল সপ্তাহে পতন আকার বড় ছিল।;

মূলধন কমার প্রসঙ্গে রেগুলেটররা (বিএসইসি) বলেন, চলতি বছরের শুরুতে মূলধন, লেনদেনসহ সূচক অতি বেড়ে যায়। এই কারণে পুঁজিবাজারে শেয়ারগুলোর দর বেড়েছিল অতিরিক্ত। পরের কয়েক সপ্তাহ অতি দরের কিছুটা লাগাম পড়েছিল। তখন শেয়ার দর কমতে থাকে। পরে কয়েক সপ্তাহ বাড়া-কমার মধ্যে কেটে যায়। হঠাৎ করেই এরপর কয়েক সপ্তাহ পুঁজিবাজার মন্দা। এ ধরনের মন্দাকে কারেকশন হিসেবে দেখা হয়েছিল। ধারনা করা হচ্ছে, কারেকশন পর ঈদের আগে শেষ সপ্তাহে পুঁজিবাজার কিছুটা উত্থানে ফিরেছে। কিন্তু ঈদের পর দুই সপ্তাহে সেই চিরচেনা পতনে ফিরেছে পুঁজিবাজার।

ডিএসই এবং সিএসই সূত্র মতে, গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে ডিএসইর পুঁজিবাজারের মূলধন দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৩ হাজার ১১৯ কোটি ৪ লাখ টাকা। গত ১৪ জুলাই মূলধন ছিল ৫ লাখ ১৫ হাজার ৯৬০ কোটি ৩ লাখ টাকা। অপরদিকে, গত বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে সিএসইর পুঁজিবাজারের মূলধন দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। গত ১৪ জুলাই মূলধন ছিল ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা। গেল সপ্তাহে ডিএসইতে মূলধন কমেছে ১২ হাজার ৮৬০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সিএসইতে মূলধন কমেছে ১৩ হাজার ৫৫৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

চলতি বছরের প্রথম তিন সপ্তাহ (১৫ কার্যদিবস) কারণ বিহীন বেড়ে উঠেছিল পুঁজিবাজার মূলধন। হঠাৎ করেই এরপরের দুই সপ্তাহ (১০ কার্যদিবস) মূলধন কমতে দেখা গেছে। তাল মিলিয়ে বছর শুরুর তিন সপ্তাহে লেনদেন উত্থানে চমক থাকলেও পরের দুই সপ্তাহে লেনদেন নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। পরের সপ্তাহে মূলধন বৃত্ত বেড়েছিল। সেখান থেকে পরের সপ্তাহগুলোতে মূলধন বাড়া-কমার মধ্যে ছিল। কিন্তু গেল সপ্তাহে মূলধন কমার গতি অনেক বেশি ছিল। সপ্তাহটিতে দুই স্টকের মিলে (ডিএসই ও সিএসই) মূলধন কমেছে ২৬ হাজার ৪১৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এ ধরনের কমাকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুঁজিবাজারে মূলধন বাড়া-কমা স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে অতিরিক্ত বৃদ্ধি যেমন ভালো লক্ষ্মণ না, তেমনি কমাও নয়। সব ক্ষেত্রেই বাড়া-কমার একটা সীমা থাকে। যখন সেই সীমা অতিক্রম করে, সেই ক্ষেত্রে সবার মনে অনেকগুলোর প্রশ্ন তৈরি হয়। এসব প্রশ্নের পরিষ্কার ও যৌক্তিক জবাব জানা থাকলে, সেটা অন্য কথা। না জানা থাকলে সেই ক্ষেত্রে বিযয়টি ভালো চোখে দেখার কথা না।

এদিকে, বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইর পুঁজিবাজারে সব ধরনের সূচক পতনে লেনদেন শেষ হয়। এক সপ্তাহে ব্যবধানে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১২৬ দশমিক ৫২ পয়েন্টে। এছাড়া ডিএসই৩০ সূচক ৩ দশমিক ২১ শতাংশ এবং শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ হাজার ২০০ দশমিক ৮৩ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ৩৪৫ দশমিক শূন্য ৯ পয়েন্টে।

সপ্তাহের ব্যবধানে সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৯৬৮ দশমিক ৮০ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসই৫০ সূচক ৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, সিএসই৩০ সূচক ২ দশমিক ৬১ শতাংশ, সিএসসিএক্স সূচক ৩ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং সিএসআই সূচক ৩ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ১ হাজার ৩১৭ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে, ১৩ হাজার ২৫২ দশমিক ৩৫ পয়েন্টে, ১০ হাজার ৭৬৪ দশমিক ১২ পয়েন্টে এবং ১ হাজার ১৩৩ দশমিক ২২ পয়েন্টে।

গেল সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৭৭০ কোটি ৬ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ৫৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সপ্তাহটিতে পাঁচ কার্যদিবস লেনদেন হয়। আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ১ হাজার ৯৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ৬৫৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ওই সপ্তাহটিতে তিন কার্যদিবস লেনদেন হয়। এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন কমেছে ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ। অপরদিকে গেল সপ্তাহে সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৭৮ কোটি ৪১ টাকা। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সপ্তাহটিতে পাঁচ কার্যদিবস লেনদেন হয়। আগের সপ্তাহে লেনদেন ছিল ৬১ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয়েছে ২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ওই সপ্তাহটিতে তিন কার্যদিবস লেনদেন হয়।;

গেল সপ্তাহে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৯৫টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৪৫টির, দর কমেছে ৩৩১টির বা ৮৩ দশমিক ৮০ শতাংশ ও অপরিবর্তিত রয়েছে ১১টির কোম্পানির। লেদনের হয়নি ৮ কোম্পানির শেয়ার। সপ্তাহে সিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৪৯টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার দর বেড়েছে ৩৯টির, দর কমেছে ৩০৫টির বা ৮৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫টির কোম্পানির।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ