দামে নেই বাড়াবাড়ি

দেশের সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার। এদিনে বেশ সময় নিয়ে কমবেশি সবাই একটু গুছিয়ে কাঁচাবাজার করতে পছন্দ করেন। একারনে অন্যান্যবারের তুলনায় এদিনে (শুক্রবার) ক্রেতার চাপ বেশি থাকে। বাজারে ক্রেতাদের অতিরিক্ত চাপের কারনে কাঁচাবাজারে প্রায় সব পন্যর দামে অন্যবারের চেয়ে কিছুটা বাড়তিও থাকে। এই বাড়তি পাওয়ার লোভে কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ীরা এদিনে ক্রেতাদের আর্কষনে বিভিন্ন ধরনের তাজা সবজি ও মাছ-মাংস পন্যর পসরা সাজিয়ে বসে।;

একারনে প্রায় সব গনমাধ্যমেই বিশেষ করে রাজধানীর কাঁচাবাজার নিয়ে গনহারে প্রতিবেদন হয়ে থাকে। এসব প্রতিবেদনে প্রতিবারেই একাধিক পন্য অতিরিক্ত দামের ঝাঁজের গল্প শোনা যেত। স্থান পেত খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট। এটা যেন আমাদের সাপ্তাহিক হালচাল। কিন্তু গতকাল শুক্রবারে ব্যক্তিক্রম ঘটলো। গতকালে দাম বাড়ানোর ঝাঁজ নেই। দাম রয়েছে আগের সপ্তাহের মতোই। ফলে গনমাধ্যমে;দামের অতিরিক্ত ঝাঁজের নেই কোন গল্প। তবে খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট তেমনটি রয়েছে। এরপরও গনমাধ্যমে সাদামাটা ভাবেই প্রতিবেদন লিখতে হচ্ছে, সবজি দাম খুব একটা বাড়েনি। পরিবর্তন হয়নি মাছ-মাংস দাম। তবে কয়েকটি সবজির দাম কমেছে।;

যেমনটা দেখা যাচ্ছে চোখ ধাঁধানো রঙিন সবজি গাজরের ক্ষেত্রে। কেজিতে কমেছে ২০ টাকা। গতকাল প্রতি কেজি গাজর ১৪০ (চায়না) টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা আগের শুক্রবার বিক্রি হয়েছিল ১৬০ টাকার বেশি। তবে দেশি গাজরের দাম পরিবর্তন হয়নি। দামের শীর্ষ পথে থাকা বনেদি সবজি টমেটো আর শিম দাম আগের মতোই রয়েছে। প্রতি কেজি ১২০ টাকা। চড়া দামের তালিকা থেকে নামার নেই কোন আলামত। সঞ্চুরির পথে কাছাকাছিতে রয়েছে বটবতি, করলা এবং বেগুন। এই সবজিগুলো আগের সপ্তাহ একই দাম ছিল। তবে চড়াও হয়ে অন্য সবজিগুলোর সাধারণ ক্রেতার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি।

এদিকে ডাবল সেঞ্চুরি ওপরের থাকা কাঁচা মরিচের দাম নেমেছে অর্ধেকের নিচে। প্রায় কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকায় ওঠানামা করছে। মরিচের ঝাঁজ কমলেও মুরগি-মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

মূলত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই চড়া সবজির বাজার। প্রায় সবজির দাম কমবেশি বেড়েছে। গত ৫ আগস্ট রাতে দেশে জ্বালানি (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন) তেলের দাম লিটারে ;৪২ থেকে ৫২ ভাগ পর্যন্ত বাড়িয়েছে সরকার। তার দুই-এক দিন পর থেকেই তার প্রভাব পড়ে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। সম্প্রতি জ্বালানির দাম লিটারে পাঁচ টাকা করে কমিয়েছে। গত সোমবার মধ্য রাত থেকে এই দাম কার্যকর হয়। জ্বালানির দাম কমলে তার প্রভাব পড়েনি সবজির বাজারে।

পাইকারী ব্যবসায়ীরা বলছেন, ৫ আগস্টে জ্বালানি নতুন দাম কার্যকরের পর ট্রাকভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবজির কেজিতে ২ টাকা বেশি গুনতে হয়েছিল। তবে খুচরা বাজারে যেভাবে বেড়েছিল, সেটা রীতিমতো অন্যায়। সম্প্রতি সরকার জ্বালানির দাম কমিয়েছে। পূর্বে জ্বালানির দাম বেড়েছিল সর্বোচ্চ ৫২ টাকা। কিন্তু কমিয়েছে ৫ টাকা। যেটা বাড়ানোর তুলনায় কমানো খুবই সামান্য। যা বাজারে কমার ক্ষেত্রে ভুমিকা রাখবে না। এটাই স্বাভাবিক।

সামনে সবজির দাম আরো বাড়তে পারে এমন আভাস দিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারণ সামনে শীতের সবজি মৌসুম আসছে। সেখানে শীতের সবজি বীজ বপন করা হয়েছে। কেবল চারাগুলো গজিয়েছে। এমন সময় তিস্তা নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিত চরমে। এতে রাজশাহী, নীলফামারী, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, কুড়িগ্রামের অর্ধশত উপজেলায় ওপরে পানিতে তলিয়ে গেছে। ওইসব উপজেলার কৃষি জমিগুলো বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নষ্ট হয়েছে তাদের জমির ফসল। তার প্রভাব আমাদের কাঁচাবাজারে পড়বে। ধারনা করছি, পূর্বের চেয়ে সামনে সবজি সরবরাহ কমবে। সরবারাহ কমলে অবশ্য সবজির দাম বাড়বে।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। প্রতি কেজিতে প্রায় ৩০ টাকা। বেশকিছু সবজিতে পার্থক্য আরো দ্বিগুন। তথ্য পাওয়া যায়, চড়া দামে গাজরের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল টমেটো ও শিম। কাঁচাবাজারে নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে থাকার চেষ্টা করছে। ব্যবসায়ীরা যুক্তি দিচ্ছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম চড়া। উত্তরাঞ্চলে বন্যা কারনে সবজি সামনে দাম বাড়বে এমন আভাস দিচ্ছেন বিক্রেতারা। তবে রাজধানীর ব্যবসায়ীদের যুক্তির সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না মফস্বলের ব্যাখ্যা। কৃষি পর্যায়ে যে পণ্য ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি রাজধানীতে এলেই তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ।

সরকারের বিভিন্ন কঠোর তদারকিও সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মিল নেই কমানোর সমন্বয়। ফলে প্রভাবে পড়েনি কাঁচাবাজারে। গাজর প্রতি কেজি ১৪০ টাকা, শিম ও টমোটো প্রতি কেজিতে বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকা ওপরে। চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে অন্য সব সবজি। বর্তমানে ৪০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো ভালো সবজি।

রাজধানীর কাওরান বাজার, কাপ্তান বাজার, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রায় সব সবজিই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। স্থান ভেদে প্রতি কেজি দামে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। চড়া দাম প্রসঙ্গে শনিরআখড়ায় সবজি ব্যবসায়ী রানা বলেন, শিমের মৌসুম না। কিন্তু বাজারে চাহিদা রয়েছে। চাহিদা থাকায় শিমের দাম কেজি প্রতি ১২০ টাকা।;

যাত্রাবাড়ীর কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, চাহিদার তুলনায় কম টমোটো বাজারে রয়েছে। যেহেতু বাজারে সরবরাহ কম, সেহেতু দাম বেশি এটাই স্বাভাবিক। বর্তমানে বাজারে টমোটো প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। সবজির দাম প্রসঙ্গে যাত্রাবাড়ীতে বাজার করতে আসা ক্রেতা নাঈম বলেন, টমেটোর দাম অনেক বেশি। আর গাজরের দামে আগুন। ছোয়াই যায় না। প্রতি কেজি গাজরে গুনতে হচ্ছে দেড়শ টাকা।

এদিকে, গতকাল শুক্রবার প্রতি কেজি বটবটি ও বেগুন বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায়। সবজির দাম কমার প্রসঙ্গে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী রহিম আকঁন বলেন, কাঁচাবাজারে সবজির চাহিদার বেশি। কিন্তু সরবরাহ কম। তাই সবজির বাজার কিছুটা বাড়তি। বেশির ভাগ সবজিতে গত সপ্তাহে একই দাম ছিল। ক্রেতা পলাশ মুনশী দুই বাজার ঘুরে মুরগি কিনেছেন। তাতে দামে পার্থক্য খুব একটা না। তিনি কাঁটাবন বাজারে সোনালি মুরগি কিনতে গেলে বিক্রেতা দাম হাঁকান ৩০০ টাকা কেজি। পাশ্ববর্তী আরেকটি বাজারে ৩১০ টাকা। একই বাজারের মাংস ব্যবসায়ী জামিল হোসেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় গরুর মাংস কেজিতে কত বাড়লো? তিনি জানান, কিছুটা কমতি। কেননা কোরবানির ঈদের সময় ৭৫০ টাকা করে বিক্রি করেছি। এখনো বিক্রি করছি ৭০০ টাকা।;

এদিকে অপরিবর্তিত রয়েছে মুরগির দাম। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি করছেন ১৮০ টাকায়। আগে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর মুরগির কেজি ২০০ টাকা উঠেছিল। ব্রয়লার মুরগির পাশাপাশি অপরিবর্তিত রয়েছে পাকিস্তানি কক বা সোনালী মুরগির দাম। বর্তমানে মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকায়।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন খোলাবাজার সূত্রে জানা যায়, খুচরা বাজারে সিমের প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা। তবে দেশি গজর ১০০ টাকা। টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা। শসা ৭০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচের প্রতি কেজি ৭০ টাকা। ঢেঁড়শের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম অপরিবর্তিত রয়েছে পেঁয়াজ ও আলুর। পেঁয়াজ গত সপ্তাহের মতো কেজি প্রতি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। এছাড়া মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা, পেঁপের ৩০ টাকা, ঝিঙা ৫০ টাকা, পটল ৪০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৬০ টাকা এবং কাঁচা পেঁপেঁ ৩০ টাকায় কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। কচুর লতি, ঝিঙে, চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৫০ টাকায়। এছাড়া প্রতিটি ফুলকফি ৫০ টাকা, পাতাকফি ৫০ টাকা এবং লাউ ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। তবে সাইজের ওপরে দাম কমবেশি রয়েছে।

রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। তেলাপিয়া, পাঙাস মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ২০০ টাকায়। শিং মাছের কেজি ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। আর ২০০ তেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কৈ মাছের কেজি। পাবদা মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। মাছের মধ্যে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে চিংড়ি ও ইলিশ। চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১৩০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ৭৫০ থেকে ১০০০ টাকা। আর ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ