বন্যার্তদের সেবায় স্যাটেলাইট

হঠাৎ বৃষ্টি আর ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে সিলেটসহ আশপাশের জেলা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। অধিকাংশ এলাকায় বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করা অনেকেই যোগাযোগ করতে পারছেন না পরিবারের সঙ্গে। কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেকের। কারো কারো মবোইল খোলা থাকলেও কোনোভাবেই পাওয়া যাচ্ছে না নেটওয়ার্ট। এতে পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়েছে তাদের। এতে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে সিলেটের বাইরে থাকা সদস্যদের।

সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা ও উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলা। এসব এলাকার জরুরি টেলিযোগাযোগ সেবা সচল রাখার চেষ্টা করছে সরকার। নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ইন্টারনেটসহ নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে ভিস্যাট যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল)। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে গত শনিবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব মো. খলিলুর রহমানের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনীকে ১২টি ভিস্যাট যন্ত্রপাতি হস্তান্তর করা হয়।

গত রবিবার নেত্রকোণা ও উত্তরবঙ্গে ভিস্যাট হাব স্থাপিত হয়। সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরকেও দেয়া হচ্ছে আরও ২৩ সেট ভিস্যাট যন্ত্রপাতি। এর ফলে আরও ২৩টি বন্যা উপদ্রুত এলাকায় জরুরি টেলিযোগাযোগ সেবা স্থাপন করা হবে। সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের প্রয়োজনে আরও ভিস্যাট যন্ত্রপাতি সরবরাহ করতে প্রস্তুত বাংলাদেশ বিসিএসসিএল। যার মাধ্যমে বন্যাকবলিত আরও এলাকায় জরুরি টেলিযোগাযোগ সেবা স্থাপন করা যাবে। মুঠোফোন কোম্পানিগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী মুঠোফোন নেটওয়ার্ক সচল করার কাজেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ব্যবহার করতে পারবে।

সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে একটি মনিটরিং সেল গঠন করেছে বিএসসিএল। যেটি মাঠ প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করবে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থায় টেলিযোগাযোগ সেবা চালু রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোবাইল অপারেটরসমূহকে বানভাসি মানুষের জন্য প্রত্যেকে তিনটি করে টোল ফ্রি নম্বর চালু করার নির্দেশে দিয়েছেন। নির্দেশনার আলোকে মোবাইল অপারেটরসমূহ টোল ফ্রি নাম্বার চালু করেছে। টোল ফ্রি নাম্বারগুলো হচ্ছে- ০১৭৬৯১৭৭২৬৬, ০১৭৬৯১৭৭২৬৭, ০১৭৬৯১৭৭২৬৮, ০১৮৫২৭৮৮০০০, ০১৮৫২৭৯৮৮০০, ০১৮৫২৮০৪৪৭৭, ০১৯৮৭৭৮১১৪৪, ০১৯৯৩৭৮১১৪৪, ০১৯৯৫৭৮১১৪৪, ০১৫১৩৯১৮০৯৬, ০১৫১৩৯১৮০৯৭, ০১৫১৩৯১৮০৯৮।

টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটনায় বন্যার্তদের বিপদ বাড়ছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ নানাবিধ কারণে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিয়েছে। দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে থেকে স্বজন প্রিয়জনদের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। বন্যা শুরুর আগে সুনামগঞ্জে ভ্রমণে গিয়ে পরে হঠাৎ বন্যায় আটকা পড়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২১ শিক্ষার্থী। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের দলটি গত ১৪ জুন সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরতে গিয়েছিল। গত ১৬ জুন সুনামগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে আটকা পড়েন তারা। এসময় তারা মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।

গত শনিবার দুপুরে পুলিশের ব্যবস্থাপনায় একটি লঞ্চে করে তাদেরসহ আরও প্রায় ১০০ জনকে সিলেটের উদ্দেশে পাঠানো হয়। তবে লঞ্চটি সন্ধ্যার দিকে দোয়ারাবাজার উপজেলা সদরের কাছে একটি ডুবোচরে আটকে যায়। সেখান প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে থাকে। মোবাইলে নেটও তখন ঠিকমতো কাজ করছিলো না। বন্ধ হয়ে যায় তাদের মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক। তাদের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছিলো না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। পরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয়, তুমুল বৃষ্টি, নদীতে প্রবল স্রোত ও অন্ধকারের কারণে সেনাবাহিনীর একটি দল উদ্ধার করতে গিয়েও ফিরে আসতে বাধ্য হয়। পরে অবশ্য তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সিলেট, সুনামগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রামসহ বন্যাকবলিত এলাকায় সব ব্যাংকের শাখাও বন্ধ হয়ে গেছে। একদিকে বন্যায় প্লাবিত হয়েছে অনেক শাখা অফিস। অন্যদিকে নেটওয়ার্ক না থাকায় ডিজিটাল লেনদেনেও বিঘ্ন ঘটে। এতে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হয় বন্যার্তদের। তবে ইতোমধ্যে নিকটবর্তী শাখা থেকে জরুরি ব্যাংকিং সেবা দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। গত রবিবার সব ব্যাংকে এ নির্দেশনা পাঠানো হয়।

তথ্য মতে, দেশের ১২ জেলার ৭০টি উপজেলার মানুষ পানিবন্দি। নতুন করে ছয়টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। এছাড়া দুজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থী স্রোতের টানে ভেসে গেছে। আরেকজন বয়স্ক ব্যক্তি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন। সিলেটবাসীকে আশার বাণী শুনিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। তবে সুনামগঞ্জে অপরিবর্তিত আছে। একই সঙ্গে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে অবনতি হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ বিভাগের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে বলা হয় গতকাল সোমবার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। আজ মঙ্গলবার থেকে পানি কমতে শুরু করবে। এই সময়ে উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও ভাটির দিকে অবনতি হতে পারে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে বন্যার্তদের যেকোনো সহায়তা প্রদান ও পাশে দাঁড়াতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তথ্য যোগাযোগ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বন্যার্তদের জরুরি সেবা পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা হলেও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ