বন-পাহাড়ের দিনরাত্রি

লোকালয় ছেড়ে দূর কোনো পাহাড়ে রোজ রোজ তো আর ঘুম ভাঙে না! পাহাড়ে এলেই মনে হয়, এরকম মাচার মতো কোনো কাঠের ঘরে আজীবন থেকে যাবো। জীবন হবে সহজ-সরল-সবুজ। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত কেটে যাবে ফুল-পাতা-মেঘে। এক হেডম্যান (মৌজা প্রধান) পাহাড়ে জমিও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক পিছুটান মুছে ফেলা কী অত সহজ!

পাহাড়ি ঘরগুলোতে চুলা ভেতরেই থাকে। ঠিক ফায়ারপ্লেসের মতো দেখতে—একইসঙ্গে রান্না ও শীতে গা গরম দুইই হয়। গত রাতের বাসি ছাই আর পোড়া কাঠ-কয়লায় চোখ পড়ে। ঘরময় রোদের কারুকাজ। বেলা হয়েছে বোঝা যায়। হাঁক-ডাক কানে আসে, জলদি উঠে পড়ার তাড়া। নির্দেশ ছিল, খেয়েদেয়ে গুছিয়ে সকাল ৭টার মধ্যেই রওনা হতে হবে। কিন্তু শরীর কী আর সেসব শুনেছে! গত দিনের অর্ধবেলা বিরক্তিকর বাসভ্রমণ আর প্রায় মধ্যরাত অব্দি ঝিরি-পাহাড়ে বিচরণ। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই একঘুমে সকাল। মন চাইছিল, পাশ ফিরে আরেকটু শুই। যেনো জীবনের আর কোনো অর্থ নেই, ওই পাঁচ-দশ মিনিটের স্বপ্নালু ওমই সকল স্বার্থকতা…

নেপালি উলের মোজা আর ম্রো কম্বলের উষ্ণতা কাটিয়ে বাইরে পা রাখি। ঘরের মেঝে কাঠের তক্তা দিয়ে বানানো হলেও খোলা বারান্দাটুকু বাঁশের চাটাই। হাঁটলে ঝমঝম শব্দ হয়। একপাশে সযত্নে সাজানো লাউয়ের খোল দিয়ে বানানো পানির পাত্র, তাতে খিলিপানের মতো কলাপাতার ছিপি। পাহাড়ে আলো ফুটতেই মেয়েরা বেরিয়ে পড়ে পানি সংগ্রহে। বহু নিচের কোনো ঝিরি থেকে থ্রুং (পিঠে ঝোলানো ঝুড়ি) ভর্তি ছোট ছোট পাত্র ভরে পানি উপরে নিয়ে আসে। সব ঝিরি আবার খাবার পানি সংগ্রহের জন্য নয়। পাহাড়ের একান্ত আলিঙ্গন আর আদরে প্রবাহিত কোনো দূর ঝর্ণার জলধারাকে তারা আলাদা করে রাখে। এই পানিতে তারা গৃহস্থালী কোনো কাজ করে না। 

রেম্বক পাড়া জেগেছে আরও আগেই। সব মিলে গোটা পনেরো বাড়ি। এখানে-ওখানে আগুন জ্বালিয়ে শীত যাপনের জটলা। গলায় বাহারি পুঁতির মালা পরা পাহাড়ি শিশুরা দুই হাত কোলে গুজে আগুন পোহাচ্ছে। তার শরীরের আকারের চেয়ে বড় সোয়েটারের মধ্যে পা দুটিও ঢোকানো। একটু পর পর সাহস করে আগুনে দু-একটি শুকনো কাঠ-পাতা ছুড়ে দেয়। চারপাশ একটু ঘুরে দেখার ইচ্ছে জাগে। তিন-চার ফুট উঁচু মাচা থেকে নামতেই খবর হয়ে যায়। শরীরের সব কোষে কোষে ব্যথা! এখনই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে বাকি দিন তো পড়েই রয়েছে। যেতে হবে বহু বহুদূর। জ্ঞানীরা বলে, মুহূর্তে বাঁচো। কাজেই আপাতত নিকট মুহূর্তগুলো কাটাই, পরেরটা পরে দেখা যাবে!

পুবদিকে পিঠ দিয়ে গায়ে রোদ মাখাচ্ছে কেউ কেউ। এই পাড়ার সবাই ম্রো। থানচি-রেমাক্রি-আলিদকদম অঞ্চলে ম্রো জনগোষ্ঠীদের বসবাস বেশি। হাসি হাসি মুখ করে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি। ম্রো বাচনভঙ্গি মেশানো ভাঙা ভাঙা বাংলায় এক তরুণ কথা বলে।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ