লোডশেডিং, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবাব আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বিদ্যুতের সুবিধা আর সেবা পৌঁছে গেছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। শতভাগ জনগণও এসেছেন এখন বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। বিদ্যুৎখাতের এই সফলতায় দেশের প্রতিটি গ্রাম, পল্লী অঞ্চল আলোয় আলোকিত। বর্তমান সরকারের বড় একটা অর্জনও এটা। তবে হঠাৎ করেই বিদ্যুখাতে বড় সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে ব্যাপকমাত্রায় বিদ্যুৎ;ঘাটতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যে কারণে লোডশেডিং বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সংকট সমাধানের আশা করছেন শিল্পখাতের উদ্যোক্তারা। তারা শিল্পে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা বলছেন।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা মোতাবেক বিদ্যুৎ না পাবার বড় কারণ অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সংকটসহ দাম বাড়ার কারণেই বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এখন তীব্র। আর ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে চলমান সংকট আরো বেশি প্রকট হয়েছে। সূত্রমতে, বর্তমানে গ্যাস সংকটে চাহিদার বিপরীতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৮২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকছে। লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, দেশে জ্বালানি তেল না থাকলেও রয়েছে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস। তবে সেই গ্যাস উত্তোলনে তেমন জোর দেয়া হয়নি এখন অবধি। প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য যেসব কূপ খনন করা হয়েছে সেসব কূপের সঞ্চয় ইতোমধ্যে কমে এসেছে। আরও কিছু কূপ থেকে অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করে চাহিদা মেটানো হচ্ছে। তবে চাহিদা বাড়ার কারণে নতুন নতুন কূপ খননের কোনো বিকল্প না বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

দেশের চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আমদানির ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমানে বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সে কারণে আর আগের দামে বিশ্ববাজার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি পাচ্ছে না বাংলাদেশ। ফলে জ্বালানিখাতে ভর্তুকি বেড়ে গেছে অতি;মাত্রায়। যে কারণে আমদানির ওপর চাপ বেড়েছে। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতির কারণে লোডশেডিং বেড়ে গেছে। আর তার বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে।

যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য ও সরবরাহ অন্যান্য সব দেশের মতো আমাদের সমস্যায় ফেলেছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তার ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লোডশেডিং সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, গ্যাস স্বল্পতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে অনেক জায়গাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুণরায় স্বাভাবিক হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বিদ্যুৎ উৎপাদন সংক্রান্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার দেশের বিদ্যুতের চাহিদার পূর্বাভাস দিনে সর্বোচ্চ ১২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। আগের দিনে বুধবার প্রকৃত উৎপাদন দিনে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৮৩৮ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১৩ হাজার ৬১৪ মেগাওয়াট। চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণেই লোডশেডিং বেড়েছে।

পিডিবির একাধিক কর্মকর্তার মতে, প্রয়োজনীয় গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। আগে যেখানে গড়ে এক হাজার ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া পাওয়া যেত, এখন সেখানে মিলছে এক হাজার ঘনফুটের কম। বিদ্যুতের ঘাটতি ঠেকাতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে হবে। না হলে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমেরই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। অন্যদিকে, তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু করে বিদ্যুতের ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে।

এদিকে, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে শিল্পখাতে উৎপাদন অব্যাহত রাখার দাবি উঠেছে ব্যবসায়ী ও শিল্পখাতের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেছেন, দেশব্যাপী লোডশেডিংয়ের প্রভাবে শিল্পকারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিরবচ্ছিন্ন শিল্পোৎপাদনের জন্য কারখানায় বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুতের রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সূত্রমতে, দেশে টাইলসের বাজারে অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান আরএকে সিরামিকস, ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের বিএসআরএম গ্রুপের মতো অনেক বড় বড় শিল্পকারখানায় ইতোমধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমতে শুরু করেছে। তাদের গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।

জানা যাচ্ছে, সিলেটের ছাতককেন্দ্রিক বহুজাতিক একটি সিমেন্ট কোম্পানিকে ইতোমধ্যে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে চিঠি দিয়েছে তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থা। এমন পরামর্শ পাওয়ার পর বিকল্প উৎস থেকে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে সেই সিমেন্ট কোম্পানি। শুধু তাই নয়, ডায়িং কারাখানাগুলোতেও গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ইতোমধ্যে অর্ধেক নেমে গেছে। শুধু সিরামিক, স্টিল আর সিমেন্টের মতো বড় বড় শিল্পকারাখানাই নয়, শীর্ষ রপ্তানি আয়ের খাত তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে পড়ছে। এসব খাতের রপ্তানিকারকেরা মনে করছেন গ্যাস আর বিদ্যুতের পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

গ্যাস আর বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব যেমন পড়ছে তেমনি ব্যক্তিগত জীবনের বড় প্রভাব পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্নিত হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার নোয়াখালীর সুবর্ণচরের বাসিন্দা শারমীন জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টি হলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়। বিদ্যুৎ সংকটে গরম ও;অন্ধকার ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে থাকতে হচ্ছে। মোবাইলে নেট;সমস্যা ও প্রচুর কল ড্রপড হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্লিজে থাকা;খাবার পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে বেশ কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ