স্বপ্নের পদ্মা সেতুর টোল

স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মার ভয়াল স্রোতকে বশে এনে তার বুকে জুড়ে দিয়েছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সেতুটিকে। ২২ মিটার প্রশস্ত সেতুটি করতে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এ টাকা উঠে আসতে সময় লাগবে ৩৫ বছরের মতো। শতবর্ষী স্থায়ীত্বের সেতুটি নিঃসন্দেহে বিশ্বের অত্যাধুনিক সেতুর একটি।

সেতুর টাকা উঠে আসার মূল জায়গা হচ্ছে টোল আদায়। ৩৫ বছরেই ব্যয়ের ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায়ে পদ্মা সেতুতে টোল নির্ধারণে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় যে ছক আঁকা হয়েছে তাতে সেতুটি পার হতে মোটর সাইকেলের জন্য টোল দিতে হবে ১০০ টাকা। প্রাইভেট কার ও জিপের জন্য ৭৫০ টাকা। মাঝারি বাসের টোল ২ হাজার টাকা, বড় বাসের জন্য ২ হাজার ৪০০ টাকা, মাইক্রোবাস ১ হাজার ৩০০ টাকা ও মিনিবাসের জন্য ১ হাজার ৪০০ টাকা দিতে হবে। ছোট ট্রাকের জন্য (৫ টন পর্যন্ত) ১ হাজার ৬০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক (৫ থেকে ৮ টন) ২ হাজার ১০০ টাকা, মাঝারি ট্রাক (৮ থেকে ১১ টন) ২ হাজার ৮০০ টাকা, বড় ট্রাক (তিন এক্সেল পর্যন্ত) ৫ হাজার ৫০০ টাকা ও টেইলারের জন্য ৬ হাজার টাকা টোল দিতে হবে।

পদ্মা সেতুতে গাড়ির লেন থাকবে একেক পাশে দুটো করে এবং একটি ব্রেকডাউন লেন। অর্থাৎ মোট ছয় লেনের ব্রিজ। যদিও একে বলা হচ্ছে ফোর লেনের ব্রিজ। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তবে ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় নয় কিলোমিটার। দ্বিতল পদ্মা সেতুর এক অংশ থাকবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায়, আরেক অংশ শরীয়তপুরের জাজিরায়। সেতুর ওপরে গাড়ি চলাচল করবে, রেল চলবে নিচের অংশে। পদ্মা সেতু নির্মাণে খরচ করা হচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। গত বছরের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এসব খরচের মধ্যে রয়েছে সেতুর অবকাঠামো তৈরি, নদী শাসন, সংযোগ সড়ক, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পরিবেশ, বেতন-ভাতা ইত্যাদি।;

অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুন সেতুর) মূল দৈর্ঘ্য ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। সঙ্গে মূল সেতুতে উঠতে দুই পাশে ভায়াডাক্ট আছে ১২৮ মিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য পাঁচ কিলোমিটারের কম। পদ্মার মূল সেতু ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। আর দুই প্রান্তের ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ১৪৮ কিলোমিটার। সেই হিসাবে সেতুর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৯ দশমিক ২৯৮ কিলোমিটার। দুই সেতুর নির্মাণ ব্যয়েও বিশাল পার্থক্য। কংক্রিটের বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণে ব্যয় হয় ৯৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। ডলারের সঙ্গে টাকার সে সময়ের বিনিময় হারে এই ব্যয় ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার আশপাশে। তবে বর্তমান বিনিময় হারের সঙ্গে তুলনা করলে এটি দাঁড়ায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি। চার লেনের পদ্মা সেতু নির্মাণ হয়েছে স্টিলের ওপরে, যাতে সড়কসেতুর নিচ দিয়ে রেল চলাচলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর নির্মাণে সবশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। ১২ ধরনের গাড়ির জন্য টোল নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হিসাব করে দেখা যায়, ছয় ধরনের গাড়িতে বঙ্গবন্ধু সেতুর তুলনায় পদ্মায় কিলোমিটার হিসাবে টোল বেশি। বাকি ছয় ধরনের গাড়িতে কম।

বাইকে পদ্মা সেতুতে কিলোমিটারপ্রতি টোল বঙ্গবন্ধুর তুলনায় ৬০ পয়সা বেশি। পিকআপ ভ্যানে পদ্মায় কিলোমিটারে বঙ্গবন্ধু সেতুর তুলনায় টোল বেশি ৭ টাকা ৩১ পয়সা। মাঝারি বাসে বঙ্গবন্ধুর তুলনায় পদ্মায় কিলোমিটারে টোল বেশি ১২ টাকা ১৭ পয়সা আর বড় বাসে বেশি ৫৫ টাকা ১৯ পয়সা। বড় আকারের থ্রি এক্সেলের ট্রাকে যমুনার তুলনায় পদ্মা পাড়ি দিতে কিলোমিটারে বেশি খরচ হবে ১৮৫ টাকা ৬৮ পয়সা। ফোর এক্সেল ট্রাকে বেশি ৩৬ টাকা ৫৩ পয়সা। প্রাইভেটকারে বঙ্গবন্ধুর তুলনায় পদ্মায় কিলোমিটারে টোল কম ৩০ টাকা ৯৫ পয়সা।

মাইক্রোবাসে বঙ্গবন্ধুর তুলনায় পদ্মায় কিলোমিটারে টোল কম ১২ টাকা ৩৭ পয়সা। ছোট বাসে এই ব্যয় কম হবে কিলোমিটারে ১ টাকা ৬২ পয়সা। পাঁচ টনের ট্রাকে পদ্মা পাড়ি দিতে কিলোমিটারে খরচ কম পড়বে ৩০ টাকা ৮৫ পয়সা। ৮ টনের ট্রাকে এই খরচ ২৭ টাকা ৭৯ পয়সা আর ১১ টনের ট্রাকে কম ২৩ টাকা ৫৪ পয়সা।

বঙ্গবন্ধু ও পদ্মা সেতুর টোল হারে কী পার্থক্য: পদ্মা পাড়ি দিতে প্রাইভেট কার ও সাধারণ জিপে টোল ঠিক করা হয়েছে ৭৫০ টাকা। ফেরিতে বর্তমানে এই ধরনের গাড়ি পারাপারে দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। যমুনা পাড়ি দিতে পদ্মার তুলনায় অর্ধেক দৈর্ঘ্যের বঙ্গবন্ধু সেতুর ক্ষেত্রে এই টোলের পরিমাণ ৫৫০ টাকা। সে ক্ষেত্রে প্রাইভেট কারে যমুনা পাড়ি দিতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ ১১১ টাকা ৬১ পয়সা। আর পদ্মা সেতুতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ ৮০ টাকা ৬৬ পয়সা। পদ্মা সেতুতে টোল প্রতি কিলোমিটারে কম ৩০ টাকা ৯৫ পয়সা।

পিকআপ ও বিলাসবহুল জিপ পারাপারে ফেরিতে দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা। পদ্মা সেতু পার হতে সেই টোলের পরিমাণ ১ হাজার ২০০ টাকা। পদ্মার তুলনায় অর্ধেক বঙ্গবন্ধু সেতুতে এই টোল ৬০০ টাকা। গাড়িতে পদ্মা সেতুতে কিলোমিটারপ্রতি টোল খরচ ১২৯ টাকা ৬ পয়সা। আর বঙ্গবন্ধু সেতুতে তা ১২১ টাকা ৭৫ পয়সা। মাওয়া প্রান্তে মাইক্রোবাস পারাপারে ফেরিতে লাগে ৮৬০ টাকা। সেটি বাড়িয়ে পদ্মা সেতুতে করা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকা। বঙ্গবন্ধু সেতুতে মাইক্রোবাসের খরচ লাগে ৭৫০ টাকা। ৩১ আসন বা এর কম আসনের ছোট বাসের জন্য পদ্মা সেতুতে দিতে হবে ১ হাজার ৪০০ টাকা। ফেরিতে এসব গাড়িকে দিতে হচ্ছে ৯৫০ টাকা। বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যমুনা পাড়ি দিতে এই ধরনের বাসকে দিতে হচ্ছে ৭৫০ টাকা।

মন্তব্য করুন






আর্কাইভ