বৃহস্পতিবার, 5 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ
সিটিজেন জার্নালিজম
Photo Report

আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষায় নোবিপ্রবির ইএসডিএম বিভাগের শিক্ষার্থীদের অনন্য সাফল্য, এক মাসেই ১০ স্কলারশিপ

Habibur Rahman Noakhali science and technology University 11 Sep, 2026 — 18:35:00 1 month ago
Share:
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বিশ্বের ছয়টি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সুযোগ পেয়েছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (ইএসডিএম) বিভাগের ১০ শিক্ষার্থী। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে একের পর এক এমন সাফল্যের খবরে উচ্ছ্বসিত পুরো বিভাগ। সাফল্যের ধরনও বিচিত্র—কেউ পেয়েছেন পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির সুযোগ, কেউ মাস্টার্সে ভর্তি ও বৃত্তি, কেউবা পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফেলোশিপ। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে ও জাপান—এই ছয় দেশে ইএসডিএম বিভাগের ৮ম থেকে ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এসব সুযোগ পেয়েছেন। বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন এই অর্জন নিয়ে চলছে আনন্দের রেশ। বিভাগের ২য় ব্যাচের শিক্ষার্থী আসমা আক্তার সোচি চলতি বছরের আগস্ট মাসে নরওয়ের ইনল্যান্ডেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড বায়োমেডিকেল সায়েন্স বিষয়ে মাস্টার্স করার সুযোগ পেয়েছেন। গত ৪ সেপ্টেম্বর ৪র্থ ব্যাচের ফাতেমা আক্তার লিমা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, এল পাসোতে পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন। বিভাগের ৭ম ব্যাচের শিক্ষার্থী জিদান রহমান যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ মেসন বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থ সিস্টেমস অ্যান্ড জিওইনফরমেশন সায়েন্সেস প্রোগ্রামে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি বৃত্তি পেয়েছেন। গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। একই ব্যাচের গোলাম মো. সবুর গত ৯ সেপ্টেম্বর অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনিতে পরিবেশ প্রকৌশল বিষয়ে পিএইচডিতে ভর্তির সুযোগের পাশাপাশি পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ ট্রেনিং প্রোগ্রাম (আইআরটিপি) স্কলারশিপ। এছাড়া এই ব্যাচের মো. ফজলুল করিম মামুন যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়, টুইন সিট ক্যাম্পাসে বায়োপ্রোডাক্টস অ্যান্ড বায়োসিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার অব সায়েন্স (এমএস) প্রোগ্রামে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে পড়াশোনা শুরু করেছেন। ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাফল্যের ধারা সবচেয়ে বেশি।৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান জিহাদ গত ২৭ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার গিয়ংসাং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্লোবাল কোরিয়া স্কলারশিপের (জিকেএস) আওতায় বায়োসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। একই ব্যাচের আবু সুফিয়ান সোহাগ দক্ষিণ কোরিয়ার হালিম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোইকা-হালিম ইউনিভার্সিটি নেক্সট ফেলোশিপ প্রোগ্রামের আওতায় পূর্ণ অর্থায়নে দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স করবেন ক্লাইমেট এআই কনভার্জেন্স প্রোগ্রামে। গত ২৫ আগস্ট তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ৮ম ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী সিথী ধর বৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের ইস্ট ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওগ্রাফি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তির পাশাপাশি পেয়েছেন গ্র্যাজুয়েট টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (জিটিএ)। গত ২২ আগস্ট তিনি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান। এই বছর ফল সেমিস্টারে শুরু হবে তাঁর এই পড়াশোনা। ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তরিকুল ইসলাম পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক প্রস্তাব। ইতালির পাডুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি ভিন্ন প্রোগ্রামে, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি, জার্মানির হার্টি স্কুল বার্লিনে ফুলি ফান্ডেড ক্লাইমেট অ্যাকশন স্কলারশিপসহ মাস্টার অব পাবলিক পলিসি, জার্মানির রুর বিশ্ববিদ্যালয় বোখুমে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাকশন বিষয়ে মাস্টার্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটর ল্যাবে ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড কোস্টাল ইনফরমেটিক্স বিষয়ে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি—এই পাঁচটি সুযোগের মধ্যে ভর্তির প্রস্তাব পেয়েছেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নিয়েছেন ইতালির পাডুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ প্রকৌশল—সয়েল প্রোটেকশন অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ট্র্যাকে মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে তিনি পেয়েছেন ইনভেস্ট ইওর ট্যালেন্ট ইন ইতালি (আইওয়াইটি) স্কলারশিপ। গত ১০ সেপ্টেম্বর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর মাস্টার্সের পড়াশোনা শুরু করেন। সবশেষে, বিভাগের ৯ম ব্যাচের শিক্ষার্থী সৈয়দ আবু জোহানি জাপানের কুমামোতো বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিষয়ে মাস্টার্স করার সুযোগ পেয়েছেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর সেশনে তাঁর পড়াশোনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার হালিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নে মাস্টার্সের সুযোগ পাওয়া আবু সুফিয়ান সোহাগের কাছে এই অর্জন এসেছে বিশেষ এক মুহূর্তে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। স্নাতক শেষ করার পরপরই শুরু করেন সেই লক্ষ্যে কাজ। সোহাগ বলেন, "স্কলারশিপ পাওয়া নিঃসন্দেহে একটা বড় অর্জন ছিল। কিন্তু বিয়ে করার দুদিনের মাথায় যখন মেইল পাই, সেই আনন্দ তখন দ্বিগুণ হয়ে ধরা দিয়েছিল। আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া। একই সঙ্গে আমার সুপারভাইজার ও পরিবারের প্রতি আমি অনেক কৃতজ্ঞ, তাঁরা আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।" এই ধারাবাহিক সাফল্যে উদ্দীপ্ত হচ্ছেন বিভাগের জুনিয়র শিক্ষার্থীরাও। ইএসডিএম বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে একই বিভাগের এতজন শিক্ষার্থীর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার খবর তাঁদের নতুন করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বলেন, "তাঁদের সাফল্য আমাদের দেখিয়ে দিচ্ছে, নোবিপ্রবি থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করার সুযোগ রয়েছে। তাঁদের অর্জন আমাদের মতো জুনিয়র শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আরও বেশি আগ্রহী করে তুলছে।" মেহেদী আরও জানান, সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে এখন থেকেই নিজেদের একাডেমিক প্রোফাইল, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিতে চান তাঁরা। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ১০ শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুযোগ পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। এ বিষয়ে ইএসডিএম বিভাগের ২য় ব্যাচের অ্যালামনি ও বর্তমান সহকারী অধ্যাপক সজীব আহমেদ বলেন, "বিভাগের ১০ জন শিক্ষার্থীর বিদেশে স্কলারশিপ অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও আনন্দের বিষয়। একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে তাঁদের সাফল্যে আমি অনুপ্রাণিত এবং আশাবাদী—তাঁরা জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে দেশ ও বিভাগের সুনাম আরও উজ্জ্বল করবেন।" শিক্ষার্থীদের এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের পেছনে বিভাগের শিক্ষকদের নিয়মিত উৎসাহ ও দিকনির্দেশনার বড় ভূমিকা আছে বলে মনে করেন ইএসডিএম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মহিনুজ্জামান। তিনি বলেন, "আমি আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটা কথা সব সময় বলি—তোমাদের জব সেক্টর শুধু বাংলাদেশ নয়, তোমাদের জব সেক্টর পুরো পৃথিবী। এই বিষয়টি আমাদের শিক্ষার্থীদের মোটিভেশন হিসেবে কাজ করেছে।" শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে তিনি আরও বলেন, "আমাদের বিভাগের শিক্ষকদের এ ক্ষেত্রে অনেক বড় একটা ভূমিকা আছে। আমাদের শিক্ষকরা সব সময় শিক্ষার্থীদের এসব বিষয়ে উৎসাহিত করেন।" আন্তর্জাতিক গবেষণায় শিক্ষকদের সম্পৃক্ততার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক মহিনুজ্জামান বলেন, "আমাদের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, আমাদের শিক্ষকেরা আন্তর্জাতিক অনেক শিক্ষকের সঙ্গে গবেষণা করেন। ফলে তাঁরা যখন আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রিফার করেন, তখন সেটা আমাদের শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপ পেতে সহায়তা করে।" বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে, একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণায় আগ্রহ, শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক গবেষণা-সম্পৃক্ততা এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ—এই তিন উপাদানই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গণ্ডি ছাড়িয়ে জলবায়ু, ভূ-পরিবেশ, পরিবেশ প্রকৌশল, বায়োসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আন্তবিষয়ক ক্ষেত্রেও এখন সুযোগ তৈরি হচ্ছে বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অর্জন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়—বরং নোবিপ্রবির ইএসডিএম বিভাগের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সক্ষমতারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন।
0 Reactions
Like
Report Information
Report ID: CJ-2026-09-11-000001
Location: Noakhali science and technology University
Incident Date: 11 Sep, 2026
Submitted by: Habibur Rahman