শুরুতে ব্যান্ডটির নাম ছিল ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’। পরে আন্তর্জাতিক একটি ব্যান্ডের নামের সঙ্গে মিল থাকায় নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘লাভ রানস ব্লাইন্ড (এলআরবি)’। তবে সংক্ষিপ্ত নাম ‘এলআরবি’-ই শ্রোতাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পায়।
শুরুর দিকে ব্যান্ডটি ইংরেজি গান কভার করলেও খুব দ্রুতই নিজেদের মৌলিক গানে মনোযোগ দেয়। রক, হার্ড রক, সফট রক, ব্লুজ ও মেলোডির মিশেলে তাদের গান নতুন এক সুরের জগৎ তৈরি করে। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাদের প্রথম ডাবল অ্যালবাম বাংলাদেশের ব্যান্ড ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হয়ে ওঠে, কারণ একসঙ্গে এতগুলো গান প্রকাশ তখন ছিল বিরল ঘটনা।
এরপর একে একে প্রকাশ পায় জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারি মন’ ও ‘স্বপ্ন’। এসব কাজ শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে ‘চলো বদলে যাই’ গানটি আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমানভাবে জনপ্রিয়।
এলআরবি শুধু স্টুডিও অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা দেশের প্রথম লাইভ অ্যালবাম প্রকাশ করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। ব্যান্ডটির কেন্দ্রীয় শক্তি ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু—একাধারে ভোকালিস্ট, লিড গিটারিস্ট, গীতিকার ও সুরকার। তাঁর গিটার ও কণ্ঠই এলআরবিকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মঞ্চে পারফর্ম করে তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ভেন্যু ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনেও পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করে ব্যান্ডটি।
তবে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর আইয়ুব বাচ্চুর আকস্মিক মৃত্যু এলআরবির যাত্রায় বড় ধাক্কা হয়ে আসে। তাঁর মৃত্যুর পর ব্যান্ডের কার্যক্রম প্রায় থমকে যায়। ধীরে ধীরে সদস্যদের যোগাযোগও কমে আসে এবং তারা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যদিও অনেকেই সংগীতচর্চায় যুক্ত আছেন, তবে এলআরবি আগের মতো সক্রিয় নেই।
এদিকে কপিরাইট ইস্যুও ব্যান্ডটির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে জটিল করে তোলে। আইয়ুব বাচ্চু জীবদ্দশায় ব্যান্ডের নাম ও গান নিবন্ধন করে গিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার জানায়, অনুমতি ছাড়া ‘এলআরবি’ নাম ব্যবহার করে কোনো কার্যক্রম চালানো যাবে না। ফলে ব্যান্ডটি পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
তবুও এলআরবি থেমে যায়নি—তাদের গান আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে বেঁচে আছে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও নিয়মিত তাদের গান পরিবেশন করে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এই কিংবদন্তি ব্যান্ডকে।
ব্যান্ডের দ্বিতীয় গিটারিস্ট আবদুল্লাহ আল মাসুদ জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সংগীত, আবেগ এবং ঐতিহ্যের ৩৫টি গৌরবময় বছর উদযাপনের এই মুহূর্তে লাভ রানস ব্লাইন্ড (এলআরবি)-এর অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত। এই যাত্রা শুধু সময়ের হিসাব নয়– এটি উৎসর্গ, অবিস্মরণীয় কিছু গান এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভক্ত ও সংগীতশিল্পীদের সংযুক্তকারী এক বন্ধনের গল্প। এই কিংবদন্তি ব্যান্ডের সদস্য হওয়া সত্যিই এক পরম সম্মান এবং আমি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে এই গর্ব বহন করি। আমাদের তৈরি করা স্মৃতি এবং যে সংগীত আজও বেঁচে আছে, তার প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি। ঐতিহ্য অব্যাহত থাকবে।’
২০০৩ সালে তিনি ব্যান্ডে যোগ দেন এবং আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। ব্যান্ডের পুনর্মিলন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘বসের (আইয়ুব বাচ্চু) শূন্যতা পূরণ হবার নয়। তাকে হারিয়ে আমার বিচ্ছিন্ন। অনেক দিন ধরেই সদস্যদের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও নিয়মিত যোগাযোগ নেই। একেকজন একেক দিকে আছি। যদি কোনো বড় আয়োজন হয়, তাহলে হয়তো সবার আবার দেখা হবে। সেটা রিইউনিয়নের মাধ্যমই সম্ভব। এর বাইরে ব্যান্ডকে কেন্দ্র করে এক হওয়ার মতো কোনো বাস্তব উপলক্ষ্য দেখি না।’
এলআরবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এসআই টুটুলও সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে লেখেন, ‘১৯৯১ সালের এই দিনে আমার বস [আইয়ুব বাচ্চু] , আমি, স্বপন ভাই এবং বন্ধু জয়, এই চারজন মিলে এই ব্যান্ডটি শুরু করেছিলাম। সে যে কত শত স্মৃতি! বলে শেষ করা যাবে না।’
এলআরবির ৩৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ব্যান্ডের ফেসবুক পেজে জানানো হয়, ‘এলআরবির নামটি বাংলাদেশে রকসংগীতের ধারাকে নতুন রূপ দিয়েছে। চিরন্তন সুর থেকে শুরু করে শক্তিশালী গানের কথা পর্যন্ত এলআরবি শুধু একটি ব্যান্ড ছিল না। এটি ছিল একটি যাত্রা, একটি আবেগ এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য একটি কণ্ঠস্বর। আয়ুব বাচ্চুর গড়া এই ঐতিহ্য আজও দেশের এবং দেশের বাইরের সংগীতশিল্পী ও শ্রোতাদের অনুপ্রাণিত করে চলেছে। ৩৫ বছরের সংগীত, স্মৃতি এবং মুহূর্ত যা আমাদের পরিচয় তৈরি করেছে। সেই রিফগুলোকে উৎসর্গ করা হলো, যা আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছে, সেই গানগুলোকে যা আমাদের সঙ্গে থেকে গেছে এবং সেই চেতনাকে যা আজও বেঁচে আছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়।’