১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১১:১১ পি.এম

হরমুজ সংকট কী ক্রুসেডের পুনরাবৃত্তি?

হরমুজ সংকট কী ক্রুসেডের পুনরাবৃত্তি?

সম্প্রতি পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া আহ্বান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা—নিজস্ব তেলের পথ নিজেদেরই পাহারা দিতে হবে। এই আহ্বানের প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলো যখন নিজেদের মতো করে একটি ‘যৌথ নৌ-জোট’ গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক সহস্রাব্দ আগের এক চেনা ছবির প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। মধ্যযুগের সেই ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধের সময় ইউরোপীয় শক্তিগুলো যেভাবে একজোট হয়েছিল, বর্তমানের এই ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ কি তারই এক আধুনিক ও কৌশলগত সংস্করণ?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ক্রুসেড ও মধ্যপ্রাচ্য সংকট

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে জেরুজালেম এবং পবিত্র ভূমি উদ্ধারের নামে ইউরোপীয় রাজন্যবর্গ ও নাইটরা একজোট হয়েছিল। তৎকালীন পোপ দ্বিতীয় আরবান যখন ইউরোপের বিভক্ত শক্তিগুলোকে অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়তে ডাক দিলেন, তখন তা কেবল ধর্মীয় উন্মাদনা নয়, বরং একটি 'ইউরোপীয় সংহতি'র জন্ম দিয়েছিল।

আজকের প্রেক্ষাপটে ‘পবিত্র ভূমি’র বদলে জায়গা করে নিয়েছে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা’। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান যেন সেই মধ্যযুগীয় আহ্বানেরই এক আধুনিক রাজনৈতিক রূপ—যেখানে অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ইউরোপকে আবার এক পতাকার নিচে আসার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

ক্রুসেড ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইউরোপের স্বার্থ

ক্রুসেডের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপীয় প্রভাব বিস্তার এবং বাণিজ্যের পথ সুগম করা। বর্তমানের নৌ-জোট গঠনের মূল লক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

জ্বালানি নিরাপত্তা: আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখতে তেলের বিকল্প নেই। হরমুজ প্রণালীতে আধিপত্য বজায় রাখা মানে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ: ক্রুসেডের সময় লেভান্ট অঞ্চলে দুর্গ তৈরি করে যেমন নিয়ন্ত্রণ রাখা হতো, এখন তেমনই রণতরী মোতায়েন করে পারস্য উপসাগরে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করা হচ্ছে।

ইউরোপীয় স্বায়ত্তশাসন: ট্রাম্পের চাপের মুখে ইউরোপ যখন নিজেদের জোট গঠন করতে চাইছে, তখন এটি আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র 'সামরিক সত্তা' হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি সমর্থন ছাড়াই যখন ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানি হরমুজ সংকটে নিজেদের জোট নিয়ে ভাবছে, তখন একে 'লিবারেল ক্রুসেড' হিসেবে অভিহিত করছেন অনেক বিশ্লেষক। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম।

১. বিভক্ত ইউরোপের ঐক্য: মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত থাকলেও ক্রুসেডের সময় তারা একত্রিত হয়েছিল। আজও ব্রেক্সিট পরবর্তী টালমাটাল ইউরোপ হরমুজ ইস্যুতে এক টেবিলে বসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

২. মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপের ধরন: সেই সময়কার নাইটদের তরবারির বদলে এখন জায়গা নিয়েছে গাইডেড মিসাইল আর ড্রোন। কিন্তু হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রটি সেই একই—মধ্যপ্রাচ্য।

৩. আদর্শিক বনাম অর্থনৈতিক লড়াই: ক্রুসেডকে ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ বলা হলেও এর পেছনে ছিল বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ। আজকের এই নৌ-জোটকে ‘মুক্ত বাণিজ্য সুরক্ষা’র কথা বলা হলেও এর মূলে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঙ্কার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার তোড়জোড় আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় বদলালেও শক্তির খেলার ব্যাকরণ বদলায় না। হরমুজ প্রণালী আজ আধুনিক বিশ্বের সেই ‘কৌশলগত গেটওয়ে’ যা রক্ষায় ইউরোপকে আবার সেই মধ্যযুগের মতো জোটবদ্ধ হতে হচ্ছে।

ইতিহাসের চাকা বৃত্তাকার

ক্রুসেডের সেই জোটবদ্ধ ইউরোপ আর আজকের নৌ-জোটের ইউরোপ—উভয়ই প্রমাণ করে যে, যখনই বড় কোনো স্বার্থ সংকটে পড়ে, তখনই দূরপ্রাচ্যের তপ্ত বালু আর নীল জলরাশিতে পশ্চিমা শক্তির পদচারণা অনিবার্য হয়ে ওঠে। হরমুজ মুক্ত করার এই মিশন তাই কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা এক পুরনো গল্পের নতুন সংস্করণ।