রাজধানীতে জ্বালানি সংকটের কারণে গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়া এবং ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার ফলে ঢাকার প্রায় ২০ শতাংশ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। গতকাল রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসের জন্য যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। মূলত তেলের সংকট এবং পাম্পগুলোর দীর্ঘ সারির কারণে পরিবহন সেবা ব্যাহত হওয়ায় অফিসফেরত মানুষসহ সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহন খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরকারিভাবে ভাড়া বৃদ্ধির কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও অনেক রুটেই চালক ও সহকারীরা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বল্প দূরত্বে ৫ থেকে ১০ টাকা এবং দূরপাল্লার রুটে বড় অঙ্কের বাড়তি টাকা দাবি করা হচ্ছে। এ নিয়ে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা এবং অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আজ বুধবার মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার বাস চলাচল করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সংগ্রহ করতেই চালকদের দিনের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। অনেক চালক জানিয়েছেন, পাম্পে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলে তাদের প্রতিদিনের ট্রিপ সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এছাড়া তেলের কোটা কমিয়ে দেওয়ায় একবার জ্বালানি নিয়ে সারা দিন গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এম এস আহমেদ খোকনও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে রাজধানীর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাস রাস্তায় নামছে না।
ভাড়া নৈরাজ্যের বিষয়ে যাত্রীরা জানান, নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা ছাড়াই পরিবহন সংশ্লিষ্টরা খেয়ালখুশি মতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন। আন্তঃজেলা বাসগুলোতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ঢাকা-মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন রুটে ভাড়ার চাপ বেড়েছে। পরিবহন মালিকদের দাবি, ২০২২ সালে নির্ধারিত ভাড়ার হার বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের দাম বৃদ্ধির বাজারে আর বাস্তবসম্মত নয়। ফলে লোকসান এড়াতে তারা ভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে যাত্রী কল্যাণ সংগঠনগুলো বলছে, সরকারি ঘোষণার আগেই ভাড়া বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে।
গণপরিবহন সংকটের সুযোগে লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোতেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে কর্মব্যস্ত সময়ে এই ভোগান্তি আরও তীব্র হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, রাজধানীর অনেক বাস সিএনজিচালিত হওয়া সত্ত্বেও চালকরা তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে কোনটি ডিজেল চালিত আর কোনটি গ্যাস চালিত তা শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় এই জালিয়াতি করা সহজ হচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম এক বিবৃতিতে সকল পরিবহন মালিককে সরকারি সিদ্ধান্তের আগে বাড়তি ভাড়া না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে যৌক্তিক ভাড়া সমন্বয়ের জন্য সরকারের কাছে বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়েছেন।