২২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৫ পি.এম

আতঙ্কের নতুন নাম ‘জলাতঙ্ক’, সচেতনতাই ভরসা

আতঙ্কের নতুন নাম ‘জলাতঙ্ক’, সচেতনতাই ভরসা

দেশজুড়ে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপের রেশ কাটতে না কাটতেই জনমনে নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাতঙ্ক। যদিও এই রোগটি এখনো মহামারি আকার ধারণ করেনি, তবে এর মরণঘাতী প্রকৃতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় হাইড্রোফোবিয়া নামে পরিচিত এই রোগটি মূলত একটি প্রাণিবাহিত ভাইরাসঘটিত ব্যাধি। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে পানির প্রতি তীব্র ভীতি সৃষ্টি হয় বলে একে জলাতঙ্ক বলা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, একবার এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেলে আক্রান্ত রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে। পরিসংখ্যন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি দশ মিনিটে একজন মানুষ এই রোগে প্রাণ হারান এবং বাংলাদেশেও প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ও গবাদিপশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।

জলাতঙ্ক মূলত আক্রান্ত কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বানর বা বেজির মতো প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। বাংলাদেশে এই সংক্রমণের প্রায় ৯৫ শতাংশই ঘটে কুকুরের কামড় থেকে, যার বড় একটি শিকার হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা। আক্রান্ত প্রাণীর লালায় থাকা র‌্যাবিস ভাইরাস মানুষের শরীরের ক্ষত বা রক্তের সংস্পর্শে এলে তা স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। সাধারণত সংক্রমণের এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত যেকোনো সময়ে এর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর মতো লক্ষণ দেখা দেয়। সবচেয়ে প্রকট লক্ষণ হলো প্রবল তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও পানি দেখে আতঙ্কিত হওয়া এবং আলো-বাতাসের সংস্পর্শে এলে অস্বাভাবিক ভয় পাওয়া। শেষ পর্যায়ে শ্বাসকষ্ট ও পক্ষাঘাতের মতো যন্ত্রণাদায়ক উপসর্গ নিয়ে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে ওঠে।

এই মরণঘাতী ব্যাধি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ। যেহেতু এই ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই সংক্রমণের পর দ্রুততম সময়ে টিকা নেওয়া জীবন রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করে। ক্ষতের ধরন বুঝে চিকিৎসকরা সাধারণত নির্দিষ্ট মেয়াদে টিকার কয়েক’টি ডোজ নেওয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে যারা নিয়মিত পশুপাখি নিয়ে কাজ করেন বা বাড়িতে পোষা প্রাণী রাখেন, তাদের জন্য অগ্রিম সতর্কতামূলক টিকা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জলাতঙ্ক নির্মূলে পোষা ও রাস্তার প্রাণীদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা প্রয়োজন।

যদি কোনো সন্দেহভাজন প্রাণী কামড় বা আঁচড় দেয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে আক্রান্ত স্থানটি প্রবহমান পানির নিচে ক্ষারযুক্ত সাবান দিয়ে অন্তত ১০ মিনিট ধরে ধুয়ে ফেলতে হবে। এটি ভাইরাসের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এরপর দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখা জরুরি যে, ক্ষতস্থানে সেলাই দেওয়া বা কোনো ধরনের অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি যেমন—ঝাড়ফুঁক, পানপড়া বা বাটিপড়ার আশ্রয় নেওয়া জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। কেবল সচেতনতা এবং সময়োচিত পদক্ষেপই পারে জলাতঙ্কের মতো ভয়ংকর রোগ থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখতে।