আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির ওপর আর্থিক চাপের তীব্রতা বৃদ্ধির পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং জ্বালানি খাতের অস্থিরতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে অর্থবিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সরকার আগামী বাজেটে ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎসের পরিবর্তে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যাতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত না হয়। তবে এই কৌশলের ফলে বিদেশি দায় পরিশোধের অঙ্ক ক্রমেই বড় হচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধ বাবদ ব্যয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বিদায়ী অর্থবছরগুলোতে তুলনামূলক কম ছিল। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ সময়কালের মধ্যে বাংলাদেশকে সব মিলিয়ে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে, যার একটি বড় অংশই হলো ঋণের সুদ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে মাত্র ৮ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই হার ১২ থেকে ১৯ শতাংশ এবং সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলঙ্কায় এটি ১২ শতাংশ। এই দুর্বল রাজস্ব কাঠামোর কারণে বাজেট ঘাটতি বাড়ছে, যা সরকারের আর্থিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজস্ব আদায়ে সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশনা দিয়েছেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি সামগ্রিক অর্থনীতিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত সরকারের আমলে গৃহীত বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় এই চাপের সৃষ্টি হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ এবং মেট্রোরেলের মতো উচ্চ ব্যয়ের প্রকল্পগুলোর কিস্তি পরিশোধ এখন শুরু হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় এবং দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দেশটিকে এক ধরনের ঋণের ফাঁদে ফেলেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে পুনরায় বিদেশি ঋণ নিলে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ঋণ নিলে ব্যাহত হবে বেসরকারি বিনিয়োগ।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মজুত বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার রোধ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা না গেলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।