সম্প্রতি গণমাধ্যমগুলোয় আলোচনায় এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। ইরাকের অভ্যন্তরে সৌদি সীমান্তবর্তী এক দুর্গম মরুভূমির মাঝে ইসরায়েল পরিচালিত এক গোপন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ঘিরে বিশ্বজুড়ে চলছে এই আলোচনা। যুদ্ধ চলাকালীন ইসরায়েলি সেনারা ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর জন্য এই ঘাঁটিটি ব্যবহার করেছিল, এমন তথ্যও উঠে এসেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। গোপন এই সামরিক ঘাঁটি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা স্যাটেলাইট প্রযুক্তি নয়, এক সাধারণ মেষপালক প্রথম আবিষ্কার করে। খবর পাওয়ার পর ইরাকি বাহিনীর একটা রেজিমেন্ট সে অঞ্চলে যাওয়ার পথে বিমান হামলার শিকার হয়। এতে একাধিক সেনা নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ‘আল জাজিরা’য় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । দ্য ভয়েস২৪-এর পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি তুলে দেওয়া হল:
ইরাকে একটি গোপন ইসরায়েলি ঘাঁটি? আমরা যা জানি
মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে নিজেদের বিমান হামলাকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ইসরায়েল ইরাকের মরুভূমির গভীরে গোপনে পরিচালিত একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছিল।
শনিবার, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্ঞাতসারেই ইসরায়েল এই স্থাপনাটি নির্মাণ করেছিল, যেখানে বিশেষ বাহিনী থাকত এবং যা তাদের বিমান বাহিনীর জন্য একটি রসদ সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। এই সামরিক ঘাঁটিতে ভূপাতিত ইসরায়েলি পাইলটদের সহায়তা করার জন্য অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলেরও ব্যবস্থা ছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, মার্চের শুরুতে এই ঘাঁটিটি প্রায় খুঁজে পাওয়া ইরাকি বাহিনীর ওপর ইসরায়েলি সেনারা এই ঘাঁটি থেকে বিমান হামলা চালিয়েছিল।
এই ঘাঁটিটি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কী জানা গেছে এবং এটি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
আমরা যা জানি তা হলো:
ইরাকে অবস্থিত ইসরায়েলি ঘাঁটিটি কীভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল?
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ওপেন-সোর্স বিশ্লেষকরা স্যাটেলাইট চিত্রের সাহায্যে সৌদি আরবের সাথে ইরাকের সীমান্তবর্তী সন্দেহভাজন স্থানটি শনাক্ত করেছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরাকি নিউজ এজেন্সি (আইএনএ) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ইরাকের যৌথ অভিযানের উপ-কমান্ডার লেফটেন্যান্ট-জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাওয়ি ঘোষণা করেছেন যে, রাজধানী থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬২ মাইল) দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত কারবালা শহরের নিকটবর্তী নাজাফ মরুভূমিতে “ব্যক্তি বা চলাচলের” খবর বাগদাদ পেয়েছে।
“তদন্তের জন্য কারবালা অপারেশনস কমান্ডের তিনটি রেজিমেন্টের একটি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। বাহিনীটি ভারী বিমান হামলার মুখে পড়ে, এতে একজন যোদ্ধা নিহত এবং আরও দুজন আহত হন,” তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন যে, পরে ইরাকি বাহিনীকে “দুটি সন্ত্রাসবিরোধী রেজিমেন্ট দ্বারা শক্তিশালী করা হয়েছিল, যারা এলাকাটিতে তল্লাশি চালিয়েছিল কিন্তু কিছুই খুঁজে পায়নি”।
ডব্লিউএসজে-এর প্রতিবেদনে ইসরায়েলের সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান মেজর-জেনারেল তোমের বারের মার্চ মাসের একটি বক্তব্যেরও উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলাকালে বিশেষ বাহিনী “অসাধারণ” অভিযান পরিচালনা করছিল। কিন্তু বার নির্দিষ্ট কোনো স্থানের কথা উল্লেখ করেননি।
গোয়েন্দা সংস্থা হরাইজন এনগেজ-এর প্রধান মাইকেল নাইটস ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন যে, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমি, যেখানে কথিত ঘাঁটিটি অবস্থিত ছিল, তার স্বল্প জনবসতি এবং বিশাল আকারের কারণে একটি গোপন সামরিক ফাঁড়ির জন্য উপযুক্ত স্থান।
তিনি বললেন, “অপারেশনের আগে এলাকাগুলো রেকি করা এবং এই ধরনের স্থানগুলো প্রস্তুত করা স্বাভাবিক।”
এই সপ্তাহে বাগদাদ থেকে আল জাজিরার মাহমুদ আবদেলওয়াহেদ জানিয়েছেন, এই এলাকার দুর্গম মরু অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবে গোপন সামরিক অভিযানের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে এবং মার্চ মাসে এক স্থানীয় মেষপালক এলাকায় বিদেশি হেলিকপ্টারের উপস্থিতি বুঝতে পেরে স্থানীয়দেরকে খবর দেওয়ার পর গোপন সামরিক ঘাঁটিটি প্রায় ফাঁস হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তীতে “ইসরায়েলের হামলায় তার গাড়িটি লক্ষ্যবস্তু হলে মেষপালকটি নিহত হন,” বলে তিনি জানান।
ইরাক কী বলেছে?
ইরাকের অভ্যন্তর থেকে সন্দেহভাজন ইসরায়েলি অভিযান সম্পর্কে ব্যাপকভাবে পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার, গোপন ইসরায়েলি ঘাঁটি সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ্যে আসার আগে, আল-মুহাম্মাদাওয়ি বলেছিলেন যে, “এই স্থানে কোনো বাহিনীর উপস্থিতির জন্য কোনো চুক্তি বা সম্মতি নেই”।
কিন্তু মার্চের শেষের দিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করে যে, বাগদাদ সন্দেহভাজন গোপন সামরিক কার্যকলাপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র জমা দিয়েছিল এবং যেকোনো গোপন অভিযানকে ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারা সপ্তাহান্তে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন এ ধরনের কোনো অভিযানে জড়িত ছিল না।
আগের দিন মার্কিন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর, রবিবার তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরাকের একজন ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আবারও এই খবর অস্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েল মরুভূমিতে কোনো গোপন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ইরাকের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের গোপন সামরিক ঘাঁটি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো “মিথ্যা”।
সোমবার এক বিবৃতিতে ইরাকি বাহিনী পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো অননুমোদিত বিদেশি বাহিনী সক্রিয় নেই এবং প্রচারিত তথ্য অসঠিক।
কিন্তু সোমবার বদর অর্গানাইজেশনের একজন আইনপ্রণেতা ইরাকের শাফাক নিউজকে জানান যে, পশ্চিম ইরাকে একটি যৌথ “মার্কিন-ইসরায়েলি” সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানির কার্যালয়ের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন ইরাকি কর্মকর্তা ‘দ্য নিউ আরব’ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, “মার্কিন সহায়তায় ও মার্কিন ছত্রছায়ায়” একটি গোপন সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
“ইরাক একটি মার্কিন প্রতারণার শিকার হয়েছে, এবং এটিকে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্ব বা এমনকি সামরিক অগ্রগতি হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না,” ওই কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার, ইরাকের কারবালা অভিযান কমান্ডার আল জাজিরাকে জানান যে, মার্চ মাসে নাজাফ মরুভূমিতে ইসরায়েলি সৈন্যদের একটি দলের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু তারা ওই অঞ্চলে ৪৮ ঘণ্টার বেশি থাকেনি।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে ইরাক ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মাঝে আটকা পড়েছে, যা দেশটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি গোপন সামরিক চৌকির আবিষ্কার বাগদাদের জন্য এক কঠিন পরিস্থিতিকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
ওয়াশিংটন ইরাকের কাছে তার ভূখণ্ডে সক্রিয় শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার জন্য আরও পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে এবং মার্চ মাসে বাগদাদ বিমানবন্দরে একটি মার্কিন কূটনৈতিক ও রসদ কেন্দ্রে হামলার পর পপুলার মবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) বা হাশদ আল-শাবি নামক একটি শিয়া আধাসামরিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে।
একটি স্থানীয় জরুরি সংকট সেলের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ড্রোন ও বিমান হামলায় পিএমএফ-এর ইউনিটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে তিনটি হামলা চালানো হয়েছে।” এতে আরও বলা হয়, অবস্থানগুলো জনশূন্য থাকায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
পিএমএফ ইরাকের নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ এবং এতে কিছু ইরানপন্থী গোষ্ঠীও রয়েছে। ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকে এবং সমগ্র অঞ্চলজুড়ে মার্কিন স্বার্থে হামলার দায় স্বীকার করেছে।
‘দ্য নিউ আরব’-কে দেওয়া এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে যে, ইরাকি কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ওই হামলাটিকে দেশটিতে পিএমএফ ইউনিটগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো মার্কিন হামলার একটি বৃহত্তর ধারার অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
ব্যাপকভাবে মনে করা হয় যে, ইরাক যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মাঝে এক কঠিন পরিস্থিতিতে আটকা পড়েছে।
আল জাজিরার আবদেলওয়াহেদ এই সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, ইরাক বছরের পর বছর ধরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যকার সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে আসছে।
ইরাকের গোপন সামরিক অভিযান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কিন্তু এই ধরনের প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, ইরাকের ভূখণ্ড হয়তো ইতিমধ্যেই একটি গোপন সামরিক ফ্রন্টের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল মুহূর্তে সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ফাঁকফোকর উন্মোচন করেছে।”
ইরান কী জবাব দিয়েছে?
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন যে, তেহরান “ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছে না এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা অবশ্যই ইরাকি সরকারের কাছে উত্থাপন করা হবে”।
তিনি বলেন, “এটা স্পষ্ট, এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলের আচরণের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, এই অঞ্চলে আঘাত হানতে, অঞ্চলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে আঘাত করার জন্য তারা কোনো রেড লাইনের সীমা মানে না।”
ইসরায়েল কী বলেছে?
ইরাকের মরুভূমিতে ইসরায়েলের একটি গোপন ঘাঁটি থাকার খবর নিয়ে দেশটি এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি।
তবে, ইসরায়েলের সরকারি কান রেডিও এর আগে জানিয়েছিল যে, ইরাকের মরুভূমিতে ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতির বিষয়টি আরব পক্ষগুলোর জানা ছিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সর্বশেষ এই অভিযোগগুলো এ প্রশ্ন আরও জোরালো করেছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে ইরাক একটি গোপন আঞ্চলিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে কি না।