ভোটের লড়াইয়ে নজিরবিহীন ভরাডুবির পর ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী লেবার পার্টি এখন খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় ১,৫০০ কাউন্সিলর পদ হারানোর পাশাপাশি ১৯৯৯ সাল থেকে নিজেদের দুর্গে পরিণত হওয়া ওয়েলসের নিয়ন্ত্রণও হারিয়েছে দলটি। এক সময়ের অপরাজেয় এই রাজনৈতিক শক্তির বর্তমান দশা ব্রিটিশ রাজনীতির প্রচলিত দ্বিদলীয় সমীকরণকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রেকর্ড পতনের ফলে ব্রিটিশ রাজনীতি থেকে দলটির বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। নির্বাচনে লেবার পার্টির ঐতিহাসিক পরাজয় এবং রাজনীতি থেকে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকির উল্লেখ করা হল:
মূল আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে আসা
লেবার পার্টির এই বিপর্যয় কেবল সাময়িক কোনো হার নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। আশির দশক থেকে ট্রেড ইউনিয়ন এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রভাব কমে আসায় দলটির প্রথাগত ভোটারদের আনুগত্যে ফাটল ধরেছে। ফলে আগের মতো কেবল আদর্শের টানে ভোটাররা আর লেবার পার্টিকে সমর্থন দিচ্ছে না। দলটি বর্তমানে তার মূল সামাজিক ভিত্তি থেকে এতটাই দূরে সরে গেছে যে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট শক্তিশালী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
নেতৃত্ব ও তৃণমূলের দূরত্ব
এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো দলের বর্তমান নেতৃত্ব ও তৃণমূলের মধ্যকার গভীর ফাটল। জেরেমি করবিনের সময় দলের সদস্য সংখ্যা ৫ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছালেও বর্তমানে তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। উত্তর ও মধ্য ইংল্যান্ডের যে শিল্পাঞ্চলগুলো একসময় লেবার পার্টির দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন দলটির প্রভাব নেই বললেই চলে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিচ্ছে 'রিফর্ম ইউকে'-র মতো ডানপন্থী দলগুলো।
গাজা ইস্যু ও নৈতিক ক্ষোভ
গাজা ইস্যুতে কিয়ার স্টারমারের বিতর্কিত অবস্থান দলটির সমর্থকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। ইসরায়েলকে সমর্থন এবং সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তটি ব্রিটিশ মুসলিম এবং তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, “ফিলিস্তিনিদের গণহারে নিধনের সময় ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়া—যার মধ্যে ব্রিটিশ অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহও অন্তর্ভুক্ত ছিল—লেবার পার্টির অনেক দীর্ঘদিনের সমর্থকদের মধ্যে প্রকৃত নৈতিক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।” এই নৈতিক বিচ্যুতি দলটির জন্য দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও চ্যালেঞ্জ
দলের ভেতরে এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের জোরালো দাবি উঠছে। অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের মতো নেতারা সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় থাকলেও তাদের সামনে রয়েছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। যদিও পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির ওপর স্টারমারের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী, কিন্তু সাধারণ সদস্যদের আস্থা ফিরে পাওয়া তাদের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা হবে।
সব মিলিয়ে, নেতৃত্ব বদল করলেই লেবার পার্টির সংকট মিটবে এমনটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দলটির শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্য যে সাংগঠনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন পুরোপুরি ধসে পড়ার মুখে। যদি দ্রুত কার্যকরী এবং মৌলিক সংস্কার করা না হয়, তবে ব্রিটিশ রাজনীতি থেকে লেবার পার্টির চিরতরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা এখন আর কেবল অমূলক নয়।
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই