৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২২ এ.এম

হাসিনা ইস্যুতে তিক্ততা, বদলাচ্ছে ঢাকা-দিল্লির সমীকরণ

হাসিনা ইস্যুতে তিক্ততা, বদলাচ্ছে ঢাকা-দিল্লির সমীকরণ

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিভিত্তিক সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে যে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই নতুন মোড় নিয়েছে। ঢাকার কঠোর ভাষার এক বিবৃতির পর দুই দেশের সম্পর্কে যে অচলাবস্থার আভাস দেখা দিয়েছিল, এখন তার মধ্যেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের নতুন ইঙ্গিত মিলছে।

শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন ঘিরে বাংলাদেশ শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিল। সরকারের অবস্থান ছিল, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কোনো অবস্থাতেই সরকারি মদতে সংবাদ সম্মেলন করতে পারেন না। জবাবে দিল্লি জানায়, ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব স্বাধীন সত্তা হিসেবে পরিচালিত হয় এবং এতে ভারতের সরকারের কোনো ভূমিকা নেই।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আপত্তি সত্ত্বেও সংবাদ সম্মেলন হলে সেখানে ভারতীয় সাংবাদিকরা প্রশ্ন করবেন না, বাংলাদেশি সাংবাদিকদেরও সুযোগ দেওয়া হবে না। বাস্তবে দেখা যায়, সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় সাংবাদিকরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাদেশি সাংবাদিকদেরও প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়। সেখানে হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের অংশগ্রহণও ছিল।

এ ঘটনার পর ঢাকায় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার বক্তব্য পর্যালোচনা করেন। পরে শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা এটিকে কেবল কূটনৈতিক নয়, রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করার পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, "পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি এবং তার সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।"

আরও বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন ভারতীয় ভূখণ্ডে শেখ হাসিনার এই মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত এবং শহীদদের প্রতি অপমান। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, "জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করেছে, দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না। বাংলাদেশ কখনোই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ও তার মাফিয়া চক্রের আর কখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থান হবে না।"

ঢাকা আরও জানায়, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সার্বভৌম-সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধে ভারত সাড়া দেয়নি বলেও উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতি প্রকাশের পর দিল্লিতে নড়াচড়া শুরু হয় বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিদেশ মন্ত্রণালয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে আত্মসমালোচনাও হয়েছে বলে জানা গেছে। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিষয় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি দেখভাল করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এ বিষয়ে সমন্বয় করেন বলেও সূত্রগুলোর দাবি।

বাংলাদেশের আপত্তি আগেই দিল্লিকে জানানো হয়েছিল এবং সংবাদ সম্মেলন হলে তা কূটনৈতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এমন সতর্কতাও দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে নতুন কূটনৈতিক বার্তার আভাস পাওয়া গেছে। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা খুব শিগগিরই একটি বিশেষ পত্র নিয়ে ঢাকা সফরে আসতে পারেন। ওই পত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ থাকবে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণও থাকতে পারে বলে আলোচনা চলছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না—এমন সম্ভাবনাও কূটনৈতিক মহলে প্রায় নিশ্চিত বলে ধরা হচ্ছে। একই সময়ে শেখ হাসিনার তৎপরতা ও ঢাকার রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জুলাই বিপ্লবের অনুষ্ঠান বয়কট এবং কিছু রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষাও পর্যালোচনায় রয়েছে।

বিদেশি কূটনীতিকদের একটি অংশ নিরাপত্তা শঙ্কায় অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেছিলেন বলেও জানা গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর মধ্যেই আগামী ১০ আগস্ট ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকায় দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি হবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ বৈঠককে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। মন্ত্রী পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করা দীনেশ ত্রিবেদীকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক—দুই পরিচয়ের সমন্বিত প্রতিনিধি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।