৮ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৯ পি.এম

রাজনৈতিক শিরোনামে চাপা পড়ছে চা শ্রমিকদের আর্তনাদ

রাজনৈতিক শিরোনামে চাপা পড়ছে চা শ্রমিকদের আর্তনাদ

দেশজুড়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে যখন আলোচনার ঝড় বইছে, ঠিক তখনই মৌলভীবাজারের বড়লেখার চা বাগানগুলো থেকে উঠে আসছে ভিন্ন এক আর্তনাদ। দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি, ন্যায্য শ্রম অধিকার এবং হস্তক্ষেপমুক্ত ইউনিয়ন নির্বাচনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন চা শ্রমিকরা। কিন্তু তাদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও সংগ্রাম কি রাজনৈতিক শিরোনামের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে নিউ সমনবাগ চা বাগানের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্যোগে মানববন্ধন ও গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এতে নিউ সমনবাগ চা বাগান ও মোকাম ডিভিশনের বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ চা শ্রমিক, ছাত্র ও যুবক অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে স্লোগান দেন।

নিউ সমনবাগ চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি নারায়ণ কালোয়ার-এর সভাপতিত্বে এবং রাঙ্গাচরণ সাঁওতালের সঞ্চালনায় কর্মসূচি শুরু হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশের চা শিল্প ও জাতীয় অর্থনীতিতে চা শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে বর্তমান মজুরিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবনধারণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতীয় সংসদে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায় এলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেন। দ্রুত এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান বক্তারা।

বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রম ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় শ্রম অধিদপ্তরের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করছে। তারা হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ইউনিয়ন নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান, যাতে শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেন।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শ্রমিকরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করেও তারা ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। তাদের এক দফা দাবি—দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি বাস্তবায়ন। একই সঙ্গে সাংগঠনিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন তারা।

বিক্ষোভে “দুনিয়ার মজদুর এক হও, এক হও” এবং “বাংলাদেশের চা শ্রমিক ঐক্যবদ্ধ হও”সহ বিভিন্ন স্লোগানে পুরো বাগান এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। সমাবেশ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত ৫০০ টাকা মজুরি কার্যকর এবং চা শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ইউপি সদস্য সুজিত কানু, সাবেক ইউপি সদস্য মতিলাল ঘাটুয়ার, সাবেক ইউপি সদস্য বুটন রিকমুন, সমনবাগ চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রাঙ্গাচরণ সাঁওতাল, সহ-সাধারণ সম্পাদক স্বপন চাষা, মোকাম ডিভিশনের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ফজল তাঁতি, সাধারণ সম্পাদক চৈতন সাহা এবং পঞ্চায়েত কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

নারী চা শ্রমিকদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন মনিমিতা বাকতি, সিলা রিকমুন এবং মোকাম ডিভিশনের নারী নেত্রী জানকি গড়াইত। এছাড়াও ছাত্র-যুবক ও বিভিন্ন স্তরের চা শ্রমিকরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।

চা বাগানের শ্রমিকদের ভাষায়, তাদের দাবি নতুন নয়; নতুন হলো হতাশা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল আর জাতীয় বিতর্কের ভিড়ে তাদের ন্যায্য মজুরি ও মানবিক জীবনের দাবি যেন বারবার পেছনে চলে যাচ্ছে। তাই বড়লেখার এই বিক্ষোভ কেবল মজুরি বৃদ্ধির দাবি নয়, বরং রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণেরও একটি মরিয়া প্রচেষ্টা।