বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলটির একাধিক স্থায়ী কমিটির সদস্য। তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ মনোনয়নে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছেন এবং আগামী ১২ আগস্ট বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে।
বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ১ আগস্ট বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে তিনি নিজেই বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী নির্ধারণ এবং নির্বাচনসংক্রান্ত অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আজ (৯ আগস্ট) বিএনপি রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। দলের পক্ষে প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ফরম দুটি নেন।
অন্যদিকে ১১ দলীয় বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি পদে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করেছে। আজ ঢাকার মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ ঘোষণা দেন।
জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে।
তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৩ আগস্ট। বাছাই হবে ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
প্রতিটি মনোনয়নপত্রে একজন প্রস্তাবক ও একজন সমর্থক থাকতে হবে, যারা সংসদ সদস্য হবেন। একজন প্রার্থী একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন, তবে যাচাই-বাছাই শেষে একটি মনোনয়নপত্রই বৈধ থাকবে।
যদি একমাত্র প্রার্থী টিকে থাকেন, তাহলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির মনোনীত প্রার্থীই জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর নির্বাচন
গত ২৪ জুলাই গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্লেখ্য, মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দপ্তরে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পথচলা
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (শিক্ষা) ক্যাডারের অধীনে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন থেকেই তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শুরু। ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন, যা ছিল পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনের এসএম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। সে সময় রাজনৈতিক কারণে তিনি গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করেন।
সরকারি চাকরিজীবনে তিনি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কোর বাংলাদেশ জাতীয় কমিশনে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯২ সালে দলের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারে ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পর ২০০৯ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালের মার্চে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নিযুক্ত হন। এরপর থেকে তিনি এ পদেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।