মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের উপস্থিতি নিয়ে বিএনপি ও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ডে মন্ত্রিসভার সদস্য থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বিব্রত হয়েছেন। তাঁদের প্রশ্ন, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে সক্রিয় করার বদলে একজন প্রতিমন্ত্রী কেন নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামলেন?
গতকাল শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ইশরাকের নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করছেন। তাঁর পাশে থাকা একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ এ সময় সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যান। একপর্যায়ে ইশরাকের একজন দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি মারেন।
ঘটনাটি এমন দিনে ঘটেছে, যেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকা পরিদর্শন করেন। বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর দিনভর কর্মসূচি ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিবাচক আলোচনা ইশরাকের কর্মকাণ্ডে অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রতিক্রিয়া জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা নিজেদের মতামত জানিয়েছেন। মাদকবিরোধী উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে তাঁরা মনে করেন, প্রতিমন্ত্রীর অভিযানে অংশ নেওয়ার ধরনটি প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ঘটনাটি আর শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে থাকেনি; এতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও বিব্রত হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।
এদিকে ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আজ রোববার দুপুরে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইশরাক অবশ্য তাঁর কর্মকাণ্ডকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘সামাজিক প্রতিরোধের’ অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আজ দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। তাঁর হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রটি বৈধ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
অস্ত্র হাতে কী করেছিলেন ইশরাক
শনিবার বিকেলে গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুমটিঘর রেলগেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ইশরাকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাঁকে গাড়ি থেকে নেমে অস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করতে দেখা যায়। তাঁর পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা রেললাইনের পাশে কয়েকজনকে ধরতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর এক দেহরক্ষী এক তরুণকে লাথি মারেন।
ঘটনাটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার একজন শীর্ষ নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামা সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কাজ নয়। তাঁদের দায়িত্ব প্রশাসনকে সহযোগিতা করা। তাঁর প্রশ্ন, ‘যেটা যার কাজ নয়, সেটা সে কেন করবে?’ এই নেতার মতে, এ ঘটনায় দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
শনিবার নিজের উদ্যোগের পক্ষে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও এলাকায় মাদকের বিস্তারের কথা তুলে ধরেছিলেন ইশরাক। পুলিশের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথাও বলেন তিনি। তাঁর দাবি, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
তবে দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উদ্দেশ্য ভালো হলেও প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড পুরো উদ্যোগকে বিতর্কিত করেছে। মাদক দমনের প্রয়োজনীয়তার বদলে এখন বেশি আলোচনা হচ্ছে তাঁর অস্ত্র প্রদর্শন এবং সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ নিয়ে।
প্রধানমন্ত্রীর এলাকা পরিদর্শনের দিনেই বিতর্ক
শনিবার সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে বেলা ১টা ৪১ মিনিট পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টায় তিনি হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা এবং মিরপুর ১০ নম্বরের হকারমুক্ত ফুটপাতসহ ১৩টি স্থান ঘুরে দেখেন। পরিচ্ছন্নতা ও সেবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেন। কোথাও পরিস্থিতির উন্নয়নে সাত দিন, কোথাও দুই সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিদর্শনে অংশ নেওয়া মন্ত্রিসভার একজন সদস্য শনিবার রাতে বলেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর দিনভর অর্জন ম্লান হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ ঘটনায় তিনি নিজেও বিব্রত ও বিরক্ত।
সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। রোববার সকালে মুঠোফোনে তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ইশরাকের উদ্দেশ্য ঠিক আছে। কিন্তু তিনি এতটা বেপরোয়া হয়ে গেলেন কেন, সেটিই প্রশ্ন। তাঁর মতে, প্রতিমন্ত্রীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির ইতিবাচক দিকগুলো আড়ালে চলে গেছে।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ওই শীর্ষ নেতাও একই ধরনের মন্তব্য করেন। ‘দুধে এক ফোঁটা চোনা’ পড়ার উপমা দিয়ে তিনি বলেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ড প্রধানমন্ত্রীর দিনভর অর্জনের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। সরকারের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণ পুরো মন্ত্রিসভাকে বিব্রত করেছে বলে মনে করেন তিনি।
ইশরাকের বক্তব্য
সমালোচনার মধ্যে আজ রোববার দেওয়া বিবৃতিতে ইশরাক দাবি করেন, একটি অস্থায়ী মাদক আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাঁদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন। হামলার আশঙ্কায় তিনি ও তাঁর সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছিলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
বিবৃতিতে স্থানীয়ভাবে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে আগে নেওয়া উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং জনবলসংকট দূর করার বিষয়ে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক-সামাজিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইশরাক আগে পুলিশের সঙ্গে আলোচনার কথা বললেও শনিবার সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১০ মিনিট পর পুলিশকে সেখানে আসতে বলেন।
ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মাসুদ রানা শনিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, প্রতিমন্ত্রী আগে থেকে পুলিশকে বিষয়টি জানাননি। তাঁরা পরে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারেন। ফলে মাদকবিরোধী উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হলেও নির্দিষ্ট এই অভিযানের আগে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় ছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রটি বৈধ কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি অস্ত্র প্রদর্শনের ধরন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালায় আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের অনুমতির পাশাপাশি অস্ত্র প্রদর্শনের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্যের মধ্যে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে—এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের ঘটনায় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্ত করে দেখবে পুলিশ। ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তের ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়ায় আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের মতে, মাদক দমনে প্রশাসনের ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে একজন প্রতিমন্ত্রী উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু নিজে অস্ত্র হাতে অভিযানে নামায় প্রশাসনের ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর নিজের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
কূটনৈতিক মহলে ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বেগ
ইশরাক বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটিরও সদস্য। তাঁর অস্ত্র হাতে অভিযানের ছবি ও ভিডিও বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে দল ও সরকার সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি করবে, তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন ওই নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ঢাকার বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নজরে বিষয়টি এসেছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর আশঙ্কা, মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের এমন ছবি কূটনীতিকেরা নেতিবাচকভাবে দেখবেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পাশাপাশি ইশরাককে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিও তুলছেন কেউ কেউ। এর মধ্যে শনিবার সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক পেজে ঢাকা-৬ আসন মাদকমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন প্রতিমন্ত্রী। মাদক কারবারে নিজের দলের কেউ জড়িত থাকলেও তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
তবে দল ও সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়া এক বিষয় নয়। পুলিশের তদন্তে অস্ত্র প্রদর্শনের আইনগত দিকটি যাচাই করা হবে। পাশাপাশি একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ডে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের কেউ কেউ এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রত্যাশা করছেন।