শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

ট্রাম্প দিলেন 'নিশ্চিহ্ন' করার হুমকি, একই দিন তার প্রতিনিধিদল ইরানের সাথে বৈঠকে

ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ একই দিন নিউইয়র্কে তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই যোগাযোগে মধ্যস্থতা করেছে কাতার।

ট্রাম্প দিলেন 'নিশ্চিহ্ন' করার হুমকি, একই দিন তার প্রতিনিধিদল ইরানের সাথে বৈঠকে

ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অথচ একই দিন নিউইয়র্কে তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই যোগাযোগে মধ্যস্থতা করেছে কাতার।

মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেন, তেহরান সমঝোতায় না এলে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার বিকল্প তার সামনে রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।

ট্রাম্প বলেন, তাকে এখন ইরান নিয়ে ‘বড় সিদ্ধান্ত’ নিতে হবে— হয় ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি করা যার মাধ্যমে দেশটিকে ‘পুনর্গঠন’ করা যায়, অথবা ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন’ দেওয়া।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উইটকফ ও কুশনার আরাগচির সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বৈঠকটি কয়েক ঘণ্টা চলে। পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, বৈঠকটি ‘খুব ভালো’ ও ‘খুব ফলপ্রসূ’ হয়েছে এবং শিগগিরই আরও বৈঠক হতে পারে।

বৈঠকটি সরাসরি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে অবশ্য দুই পক্ষের বক্তব্য পুরোপুরি এক নয়। ট্রাম্প এটিকে উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে ইরানি প্রতিনিধিদের তিন ঘণ্টার বৈঠক বলেছেন। উইটকফের বক্তব্য, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে আলোচনা এগিয়ে নিয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম অবশ্য আরাগচি ও উইটকফের বৈঠকের কথা নিশ্চিত করেছে।

পারমাণবিক কর্মসূচি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নির্দেশেই উইটকফ ও কুশনার ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ যেসব কর্মকাণ্ড ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকে নিতে পারে, সেগুলো বন্ধ করাই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য।

রুবিও অবশ্য এ যোগাযোগকে বড় কোনো অগ্রগতি হিসেবে দেখার মতো অবস্থায় পৌঁছানোর কথা বলেননি। তার মতে, দুপক্ষের মধ্যে আবার যোগাযোগ তৈরি হওয়াটাই আপাতত গুরুত্বপূর্ণ।

রুবিও বলেন, ধারণা ও বার্তা বিনিময়ের কোনো সুযোগ থাকলে আমরা তা করব।

তবে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েই আলোচনা হবে না। রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও আলোচনায় আনতে হবে।

যুদ্ধ বন্ধ ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি ইরানের

আলোচনায় ইরানের অগ্রাধিকার ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।

ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধ করা।

হরমুজ প্রণালিকেও আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করেছে তেহরান। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমালে এবং অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ আবার খুলে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ফলে পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি যুদ্ধ, অবরোধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ—সবগুলো বিষয়ই এখন সম্ভাব্য দর-কষাকষির অংশ হয়ে উঠেছে।

সমঝোতার পথে বড় বাধা

এখনই নিউইয়র্কের বৈঠককে সমঝোতার সূচনা হিসেবে দেখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ দুই পক্ষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়ে গেছে।

ইরান যুদ্ধ ও সামরিক চাপ কমানোর পাশাপাশি নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ সম্পদ ফেরত চায়। যুক্তরাষ্ট্রের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করার দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা। এর সঙ্গে হরমুজ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ও যুক্ত করতে চাইছে ওয়াশিংটন।

সাবেক মার্কিন ইরানবিষয়ক শীর্ষ আলোচক রবার্ট ম্যালি মনে করেন, দুপক্ষই নিজেদের অবস্থানকে তুলনামূলক শক্তিশালী মনে করছে এবং অন্য পক্ষের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে বলে বিশ্বাস করছে।

তবে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার এই যোগাযোগকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সামরিক উত্তেজনা চললেও দুই পক্ষ যে যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে, নিউইয়র্কের বৈঠক তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হুতি ও হরমুজ ঘিরে বাড়ছে আঞ্চলিক ঝুঁকি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের তৎপরতাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। হুতিদের অভিযান বাড়ায় ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ফ্রন্টের যোগসূত্র আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

এর প্রভাব পড়তে পারে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়িয়েছে। ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। সংঘাত দীর্ঘ হলে পরিবহন ব্যয় ও জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরান ইস্যুতে চীনের অবস্থান

এই পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরানের সঙ্গে বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরানের ওপর প্রভাব বিস্তারে চীনকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।

এরই মধ্যে হোয়াইট হাউজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়েছেন ট্রাম্প। দুই নেতার দ্বিপাক্ষিক বৈঠকেও ইরান প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে জিনপিং জানিয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষেই রয়েছে চীন।

হামলার পরও কেন আলোচনায় ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র?

জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে মার্কিন হামলার পরও ওয়াশিংটন কেন আবার আলোচনার পথ বেছে নিচ্ছে, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন রুবিও।

তার যুক্তি, শুধু পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। ইরান যাতে ভবিষ্যতে আবার পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, সে জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিশ্রুতি প্রয়োজন।

‘যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানকে ঘিরে এই ঝুঁকি থাকবে, ততক্ষণ বিশ্বের জন্য এটি একটি গ্রহণযোগ্য ঝুঁকি নয়,’— বলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

অর্থাৎ সামরিক অভিযানে ইরানের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেই সক্ষমতা পুনর্গঠনের পথ বন্ধ করতে রাজনৈতিক সমঝোতার প্রয়োজন দেখছে ওয়াশিংটন।

একই সঙ্গে চাপ ও কূটনীতি

ট্রাম্পের হুমকি এবং তার দূতদের আরাগচির সঙ্গে বৈঠককে তাই ইরান নীতির দুটি আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। প্রকাশ্যে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপের বার্তা দিচ্ছে ওয়াশিংটন, আর একই সময়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার সম্ভাবনাও যাচাই করছে।

তেহরানও পালটা চাপের কৌশল নিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ, অবরোধ, জব্দ সম্পদ ও যুদ্ধ বন্ধের বিষয়গুলোকে আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করেছে তারা।

নিউইয়র্কের বৈঠক থেকে এখনো বড় কোনো সমঝোতা আসেনি। তবে জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার দূতদের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দীর্ঘ বৈঠক হওয়া একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—যুদ্ধের হুমকি যতই তীব্র হোক, কূটনীতির যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স