সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদী এবং শাখা নদীগুলোতে চলছে কোটি টাকার ‘নিরাপত্তা বাণিজ্য’। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান থেকে জেলেদের রক্ষা করা এবং ধরা ইলিশ বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ট্রলারপ্রতি ২ হাজার টাকা ও মাছ বিক্রির অর্থের ১০ শতাংশ চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। এই বাণিজ্যের নেপথ্যে হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছর অক্টোবর মাসে দেশের নদ-নদীতে ২২ দিনের জন্য সব ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। এ বছর ৮ অক্টোবর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করছে। বরিশালেও মাছ শিকার বন্ধে অভিযান চলছে।
তবে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ শিকারের কারণে প্রতিবছরই মেঘনা নদীর তীরবর্তী হিজলার অন্তরবাম ও মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব এলাকায় হাজার হাজার জেলে দলবদ্ধভাবে ইলিশ শিকার করেন। শুধু এই দুটি পয়েন্টেই নয়, আশপাশের শাখা নদীগুলোতেও শত শত ট্রলারে মাছ ধরা হয়।
এসব ট্রলার আটকাতে অভিযানে গেলে মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হামলার শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবছর এ ধরনের ঘটনায় মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আহত হন। গত সপ্তাহেও জেলেদের হামলায় মৎস্য বিভাগের একজন কর্মী আহত হয়েছেন।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অভিযানে জনবল কম থাকলে এই দুই পয়েন্টে জেলেরা হামলা চালান। জেলেদের সংখ্যা শত শত হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযানে জেলেদের হামলার পেছনে প্রভাবশালী মহলের মদদ রয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তবে তাঁরা নিজেদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য দপ্তর এবং বরিশাল জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, সব সরকারের আমলেই নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ নিয়ে বাণিজ্য করেন প্রভাবশালী নেতারা।
তাঁদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন সরকারদলীয় ব্যক্তিরা এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন। বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা একই দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আগেও এসব এলাকায় অভিযানের সময় হামলার শিকার হয়েছেন তাঁরা। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। প্রভাবশালীরাই জেলেদের সাহস জোগান এবং মাছ শিকারের পাশাপাশি ইলিশ বিক্রির ব্যবস্থাও করেন বলে অভিযোগ কর্মকর্তাদের।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ শিকার করতে যাওয়া কয়েকজন জেলের বক্তব্যেও। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তাঁরা জানান, প্রতিটি ট্রলারের জন্য ২ হাজার টাকা দিতে হয়। পাশাপাশি ছয়টি পয়েন্টে বসা নিলামের হাটে বিক্রি হওয়া ইলিশের দামের ১০ শতাংশও দিতে হয় নেতাদের লোকজনকে।
টাকা দেওয়ার বিনিময়ে কী সুবিধা পাওয়া যায়, জানতে চাইলে জেলেরা বলেন, তাঁদের ট্রলারে জেলেদের পাশাপাশি নেতাদের লোকজনও থাকেন। অভিযান পরিচালনাকারী দল এলে তাঁরাই নদীতে বাধা দেন। আবার কাউকে আটক করা হলে কারাগারে না পাঠিয়ে সামান্য জরিমানা দিয়ে ছাড়িয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয় বলে তাঁদের দাবি। তাঁদের ভাষ্য, ৩০ জনকে আটক করা হলেও জরিমানা বা সাজা হয় মাত্র চার-পাঁচজনের। বাকিদের বিভিন্ন উপায়ে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়।
জেলেদের দাবি, ট্রলারপ্রতি টাকা এবং মাছ বিক্রির ভাগ মিলিয়ে নেতাদের প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।
নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা ইলিশ বিক্রির জন্য প্রতি রাতে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ছয়টি পয়েন্টে নিলামের হাট বসে। এসব হাটে ইলিশ কিনতে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের মাছ ব্যবসায়ীরা আসেন। সন্ধ্যার পর শুরু হওয়া কেনাবেচা চলে ভোররাত পর্যন্ত। প্রতি রাতে এসব হাটে কয়েক কোটি টাকার ইলিশ বিক্রি হয় বলে জানা গেছে। বিক্রির অর্থের ১০ শতাংশ নেতাদের দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই টাকা সংগ্রহ করতে হাটগুলোতে তাঁদের লোকজন অবস্থান করেন।
জেলে ও ইলিশ ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টুমচর নদীর পাড়ে বেবজিয়াপাড়ার নিলামের হাটে টাকা তোলেন রিফাত। আবুপুর লঞ্চঘাট এলাকায় এই দায়িত্বে রয়েছেন খালিদ। নাচোকাঠিতে টাকা তোলেন চুন্নু ও ফরহাদ। শংকরপাশা-কাকুড়িয়া এলাকায় দায়িত্বে রয়েছেন ইসমাইল, বাসার, নোমান ফারুক, মোস্তফা, আলম ও দুলু। অন্তরবাম-চরকিল্লা-জানপুর এলাকায় টাকা তোলেন খোকা ও লিটন। তিন নম্বর মাছঘাটে খোকা, তাঁর ছেলে ও ভাগনেরা এই কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারে বসা ইলিশের খোলা বাজার থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব বাজার ও ট্রলার থেকে সংগ্রহ করা টাকা তাহের ও আলাউদ্দিন নেতাদের কাছে পৌঁছে দেন বলে জেলে ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এই দুজন তৎকালীন নেতাদের সহায়তা করতেন, এখনো তাঁরা একই কাজে যুক্ত রয়েছেন।
ট্রলার ও নিলামের হাট থেকে সংগ্রহ করা টাকা হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরির কাছে পৌঁছায় বলে অভিযোগ উঠেছে। নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ বাণিজ্যের পুরো কার্যক্রম তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নেতৃত্বেই মেঘনা ও এর শাখা নদীগুলোতে জেলেদের এমন দৌরাত্ম্য চলছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাহেরের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমি ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। আমি এসবের মধ্যে নেই।’
অভিযোগ অস্বীকার করে খোকন দপ্তরি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। আমি কেন নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ শিকারে সহায়তা করতে যাব?’
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে ইলিশ শিকার ও ধরা পড়ার পর জেলেদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অভিযানের সময় আটক হওয়ার পর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড ছাড়া কাউকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা গত নয় দিনে ঘটেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেকের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। এ ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ কেউ দিতে পারলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।