শনিবার, 17 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ভোরে যুব উন্নয়নের প্রশ্নপত্র পান এনবিআরের ২ কর্মী, পরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তরসহ: এসআরবি

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কর্মীর কাছে ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি পৌঁছায়। পরে সেই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে যায় চাকরিপ্রার্থী ও প্রশ্নপত্রের ক্রেতাদের কাছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনের বার্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

ভোরে যুব উন্নয়নের প্রশ্নপত্র পান এনবিআরের ২ কর্মী, পরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তরসহ: এসআরবি
ছবিতে ওপরে বাঁ থেকে নূর মোহাম্মদ, জাহাঙ্গীর ও আসাদুল ইসলাম; নিচে বাঁ থেকে এস এম ইমদাদুল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম, মো. রুবেল ইসলাম ও মো. হাসিনুর রহমান ছবি: এসআরবির সৌজন্যে

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দুই কর্মীর কাছে ভোরে প্রশ্নপত্রের ছবি পৌঁছায়। পরে সেই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে উত্তরপত্র পৌঁছে যায় চাকরিপ্রার্থী ও প্রশ্নপত্রের ক্রেতাদের কাছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনের বার্তা ও তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত তিন দিনে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি। তাঁদের মধ্যে এনবিআর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী রয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র ও চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮) ও এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং চক্রের দুই সদস্য মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।

গত শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পরীক্ষার্থীরা। ঘটনার তদন্তে ওই দিনই পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে এ কমিটির প্রধান করা হয়। তবে কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে শুক্রবার আবারও নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর ছায়া তদন্ত

এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন জানান, ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। এতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। সেদিন সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর সময় নির্ধারিত থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।

ঘটনার পর ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। এরপর সংস্থাটির গোয়েন্দা দল প্রশ্নপত্রের সম্ভাব্য উৎস, সরবরাহকারী, মধ্যবর্তী বিতরণকারী ও গ্রাহকদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান শুরু করে। তদন্তে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর ১৪, ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মতিঝিল থেকে শুরু, পরে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাঁকে আরও দুজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার মফিজুল একজন চাকরিপ্রার্থী। একটি চক্রের সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর আরও বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি ওই চক্রে যোগ দেন বলে জানিয়েছে এসআরবি। তাঁদের দেওয়া তথ্য ও মুঠোফোনে কথোপকথন বিশ্লেষণ করে চক্রের অন্য সদস্যদের সন্ধান পাওয়া যায়।

এরপর উত্তরখান এলাকা থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলামকে এবং মিরপুর ১০ এলাকা থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মুঠোফোনের চ্যাটের তথ্যের সূত্র ধরে গত বৃহস্পতিবার সাভার এলাকা থেকে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে শুক্রবার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফিন বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুঠোফোনে আদান-প্রদান করা বার্তা বিশ্লেষণ করে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ ও বিতরণের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের মুঠোফোনে একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি আসে। এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর, সকাল সোয়া ছয়টার দিকে, একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।

পরে নূর মোহাম্মদ প্রশ্নপত্রের উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তাঁর সহকর্মী ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান। এরপর চক্রের সদস্যদের নিজস্ব প্রার্থী এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে এসব তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। এ প্রক্রিয়ায় আসাদুল ইসলাম, রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেন করতেন। পরিচিত চাকরিপ্রার্থীদের কাছে তাঁরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। তবে কতজনের কাছে প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়ে তাঁরা কিছু জানাননি।

জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে জানায় এসআরবি। তাঁদের দাবি অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় ফাঁস করতেন তাঁরা।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ ও কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাইলে এসআরবি কর্মকর্তা ফায়েজুল আরেফিন বলেন, তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।