ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে এখনো আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ জন্য ইরানকে পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর মতে, শুধু ভবিষ্যতে পরমাণু কর্মসূচি সীমিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেই হবে না, এ ক্ষেত্রে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে তেহরানকে।
দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ভ্যান্স। বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট গত জুনে একটি অস্থায়ী শান্তিচুক্তির মধ্যস্থতা করেছিলেন। তবে সেই চুক্তি বেশিদিন টেকেনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। পাশাপাশি আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান দলের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়িয়েছে।
সোমবার আলাস্কায় নির্বাচনী প্রচার শেষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, যেকোনো চুক্তির আওতায় ইরানের পরমাণু জ্বালানি সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা কমাতে হবে। শুধু ভবিষ্যতে কর্মসূচি সীমিত করার আশ্বাস যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, কোনো দেশের পরমাণু অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা না থাকলে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে প্রমাণ করতে হলে উচ্চমাত্রায় জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ থেকেও বিরত থাকতে হবে।
ভ্যান্সের ভাষ্য, পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে ইরান আন্তরিক হলে দেশটিকে সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কমানোর ক্ষেত্রে অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাব বিনিময়
যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে। তবে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদার হতে পারে।
ভ্যান্স জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। তবে চুক্তির জন্য ইরানকে পরমাণু কর্মসূচিতে বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট ছাড় দিতে হবে। শুধু কথার ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা
ইরানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় তাঁদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন ভ্যান্স।
তিনি বলেন, ইরানে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। মঙ্গলবার ট্রাম্পও বলেছেন, ইরানকে আসলে কে পরিচালনা করছে, তা বুঝতে না পারাই তাঁর অন্যতম বড় সমস্যা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। রোববার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁদের ইরানি প্রতিপক্ষ এবং দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবেই জানেন।
বাঘাইয়ের দাবি, সমস্যাটি ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও বক্তব্যই আলোচনাকে জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধ পরিচালনায় মাসে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের আর্থিক ব্যয়ও মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দল এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে রাজনৈতিক চাপে পড়েছে, যেগুলো কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা কমানোর চেষ্টা করছেন ভ্যান্স। আগামী মাসের নির্বাচনে শুধু এই একটি ইস্যুর কারণে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার না করতে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে আগ্রহী থাকলেও ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা কমানোর শর্তটি আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে রয়েছে।