বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সাফিকুর রহমানের বাসায় ১১ বছর বয়সী এক গৃহকর্মীকে নির্যাতনের মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের নানা বিবরণ উঠে এসেছে। গত ৩১ আগস্ট ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা-পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া।
তিনি বলেন, “তদন্ত শেষে গত মাসে চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। মামলার ঘটনা সত্য।
“ভিকটিমকে কীভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল, তা অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।”
মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। পরে সেখান থেকে মামলাটি ঢাকার সপ্তম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সোহেল রানার কাছে পাঠানো হয়।
মামলার বাদী শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “আসামিদের বিচার চাই। আমার মেয়েকে এমনভাবে নির্যাতন করেছে, অন্যদের সঙ্গে যেন এমনটা না করতে পারে। দৃষ্টান্তমূলক সাজা চাই।
“আসামিদের উপযুক্ত বিচার না হলে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আমি আদালতেই আত্মহত্যা করব’।”
মোস্তফা তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে ঢাকার আশুলিয়া এলাকায় থাকেন। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “শরীরের ক্ষতের দাগগুলো এখনো রয়ে গেছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না।”
অভিযোগপত্রে নির্যাতনের যে বিবরণ
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাফিকুর রহমান ও বীথি আক্তারের সন্তানকে দেখাশোনার জন্য ওই শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। তবে কিছুদিন পর থেকেই ‘কোনো কারণ ছাড়াই’ শিশুটির ওপর নির্যাতন শুরু করেন বীথি। গৃহকর্ত্রীর আচরণ দেখে এবং তাঁর নির্দেশে বাসার দুই বয়স্ক গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমও শিশুটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতে শুরু করেন।
শিশুটিকে দিয়ে কাজ করানো হলেও ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। দিনের পর দিন তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষায়, “ভিকটিম বাথরুম থেকে বের হতে চাইলে তাকে বের হতে দিত না। বাঁচার জন্য সে বাথরুমের পানি, দাঁত মাজার পেস্ট খেত। আবার তাকে বাথরুম থেকে বের করে কাজ করাত।
“অসুস্থ হয়ে সে কাজ করতে না পারলে বীথিসহ তার দুই গৃহকর্মী মিলে রান্না করার লোহার খুন্তি চুলার আগুনে গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দিত। বাঁশের (কঞ্চি) লাঠি দিয়ে আঘাত করত।
“ভিকটিমের বাবা দেখা করতে আসলে দেখা করতে দিত না। দেখা করতে দিলেও বড় জামাকাপড় পরিয়ে দেখা করাত। বীথিসহ কাজের বুয়ারা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত।”
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বীথি তার বাবাকে ডেকে পাঠান। পরে ‘ভুলভাল’ বুঝিয়ে শিশুটিকে তাঁর বাবার হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সাফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাঁর স্ত্রী দিনের পর দিন গরম খুন্তি দিয়ে শিশুটির শরীরে নির্যাতন চালালেও তিনি তা দেখেও না দেখার ভান করতেন। স্ত্রীর অন্যায় ও অপরাধের দায় তিনি এড়াতে পারেন না বলে উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তবে সাফিকুর রহমানের আইনজীবী আরিফুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “শিশুটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সে বলেছে, ‘এমডিকে কখনো দেখেনি’।
“আর চার্জশিট আসলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। আমরা ট্রায়াল ফেস করব।”
তিনি আরও বলেন, “উনার দ্বারা এমন কাজ করা সম্ভব না। উনি একটা উচ্চপদে চাকরি করেছেন।
“তার দুটি বাচ্চা আছে। দুজন কাজের লোক ছিল। উনি সবদিকে খেয়াল রাখতে পারেননি।”
আদালতে শিশুর জবানবন্দি
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের কাছে নিজের ওপর নির্যাতনের বিবরণ দেয় শিশুটি।
জবানবন্দিতে সে জানায়, তার কাজ ছিল ‘এমডি স্যারের’ সন্তানকে দেখাশোনা করা এবং শিশুটি মাটিতে কিছু ফেলে দিলে তা তুলে রাখা। কিন্তু বাসায় নেওয়ার পর থেকেই বীথি তাকে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন। চিৎকার করলে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারতেন। পায়ের রান, দুই হাত ও পিঠে গরম খুন্তি দিয়ে আঘাত করা হতো। চোখে মরিচের গুঁড়া দিয়ে চেপে ধরার অভিযোগও করে শিশুটি।
তার বাবা দেখা করতে এলে তাকে বড় জামা পরিয়ে বাবার সামনে পাঠানো হতো। এ সময় ‘ম্যাডাম’ ও বাসার অন্য গৃহকর্মীরা পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। ওই গৃহকর্মীরাও তাকে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতেন এবং লাঠি দিয়ে মারতেন বলে জানায় সে। পুতা বা নোড়া দিয়ে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করে শিশুটি।
শিশুটি আরও জানায়, বাসায় নেওয়ার পর থেকেই তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকার কারণে তার পায়ে পচন ধরে যায়। পুরো শীত মৌসুমে তাকে শীতের কাপড় দেওয়া হয়নি। বাসায় যাওয়ার পর তাকে খাবারও দেওয়া হয়নি; পেস্ট ও বাথরুমের পানি খেয়ে থাকতে হয়েছে। ‘স্যারের’ সামনে যেতে দেওয়া হতো না। বাসায় যাওয়ার পর থেকেই বীথি ও অন্য গৃহকর্মীরা তাকে বাথরুমে আটকে রাখতেন।
এদিকে, গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইসমাইলের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বীথি আক্তার। সেখানে তিনি শিশুটিকে বিভিন্ন সময়ে তিন-চার দিন মারধর করার কথা স্বীকার করেন। তবে তাঁর জবানবন্দিতে শিশুটির ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ আসেনি।
বাসার আরেক গৃহকর্মী সুফিয়া বেগমও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তিনি দাবি করেন, শিশুটি তাঁর বিরুদ্ধে বীথির কাছে নারিকেল তেল ও সাবান চুরির ‘মিথ্যা অভিযোগ’ করেছিল। এ কারণে তিনি দুই দিন শিশুটিকে মারধর করেন।
যেভাবে সামনে আসে নির্যাতনের ঘটনা
শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় তার বাবা গত ১ ফেব্রুয়ারি সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই রাতেই চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সাফিকুর রহমান ও রুপালী খাতুন জামিন পান। তবে বীথি আক্তার ও সুফিয়া বেগম এখনো কারাগারে রয়েছেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে সাফিকুর রহমানের বাসার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর ছোট শিশুর দেখাশোনার জন্য ১১ বছর বয়সী মেয়েটিকে গৃহকর্মী হিসেবে খুঁজে দেন। মেয়েটির বিয়ে ও অন্যান্য খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলে তার হোটেলকর্মী বাবা গত বছরের জুন মাসে তাকে ওই বাসায় পাঠান।
মামলায় বলা হয়, গত বছরের ২ নভেম্বর সর্বশেষ ওই বাসায় গিয়ে মেয়েকে দেখে আসেন তার বাবা। এরপর আর মেয়েকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩১ জানুয়ারি সাফিকুর রহমানের স্ত্রী ফোন করে গৃহকর্মী শিশুটির অসুস্থতার কথা জানান এবং তাকে নিয়ে যেতে বলেন। পরে মেয়েকে আনতে গিয়ে তার শরীরে ‘অমানবিক নির্যাতনের’ চিহ্ন দেখতে পান বাবা। এরপর শিশুটিকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়