সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সৌদি আরবে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, মরদেহ দেখতে চান বাবা-মা

দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন নজরুল। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা বাকি ছিল।

সৌদি আরবে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, মরদেহ দেখতে চান বাবা-মা
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন সৌদি আরবে থেকেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করতে পারেননি আবদুল বাছির। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন তিনি। পরিবারের সচ্ছলতার আশায় ছয় লাখ টাকা ঋণ করে ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ছেলে নজরুল ইসলামকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার আট মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন নজরুল। তখনো ঋণের সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা বাকি ছিল।

ছেলের গ্রেপ্তারের প্রায় তিন বছর পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পান আবদুল বাছির। সেই খবর শোনার পর থেকে নিজেকে আর স্বাভাবিক রাখতে পারছেন না তিনি। এখন তাঁর ও স্ত্রী রহিমা বেগমের একটাই চাওয়া—সৌদি আরব থেকে ছেলের মরদেহ দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চান তাঁরা।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সম্প্রতি দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গত বুধবার এ তথ্য জানায় সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ)। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এ বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

নজরুলের বয়স ছিল ২৫ বছর। তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি গ্রামে। বাবা আবদুল বাছির ও মা রহিমা বেগমের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনি বড়। ২০২০ সালে একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

নজরুলের বাবা টানা ২৪ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। ২০২০ সালে দেশে ফিরে কৃষিকাজ শুরু করেন। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকলেও পরিবারের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি করতে পারেননি তিনি। নজরুলের ১৪ বছর বয়সী ছোট ভাই স্থানীয় একটি দাখিল মাদ্রাসায় পড়ে। তাঁর এক বোনের বয়স নয় বছর; সে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট বোনের বয়স চার বছর।

খবর শুনে ফুফুর মৃত্যু

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ২০২২ সালের নভেম্বরে সৌদি আরবে যান নজরুল। মক্কার হারাম শরিফে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। দেশটিতে যাওয়ার আট মাসের মাথায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর থেকে সৌদি আরবের কারাগারে ছিলেন তিনি। গ্রেপ্তারের প্রায় এক মাস পর পরিবার তাঁর আটক হওয়ার বিষয়টি জানতে পারে।

কারাগার থেকে মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ পেতেন নজরুল। তাঁদের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয় ১১ অক্টোবর। সেদিন প্রায় দুই থেকে আড়াই মিনিট কথা হয়েছিল। এরপর গত বুধবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সৌদি আরব থেকে একজন ফোন করে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পরিবারকে জানান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে মূর্ছা যান তাঁর ৬৫ বছর বয়সী ফুফু আবেদা বেগম। ওই দিন রাত দুইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

ষড়যন্ত্রের অভিযোগ স্বজন ও বন্ধুদের

আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছে নজরুল ছিলেন বিনয়ী ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ। সৌদি আরবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না বলে দাবি তাঁদের। এ ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।

নজরুলের দূরসম্পর্কের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়া জানান, সৌদি আরবে পরিচ্ছন্নতার কাজ করার সময় একজনের সঙ্গে নজরুলের বিরোধ হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে তাঁর বাবা-মাকেও জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে তাঁদের জানিয়েছিলেন নজরুল। সেই ব্যক্তির ষড়যন্ত্রেই নজরুলের এমন পরিণতি হয়েছে বলে মনে করেন তাঁরা।

নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেন, সৌদি আরবে তাঁর বন্ধুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা নজরুলের চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, নজরুল এ ধরনের কাজ করেছেন, তা বিশ্বাস করা তাঁর পক্ষে কঠিন।

নজরুল যে দাখিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমান বলেন, নজরুলের আচার-আচরণ ও চলাফেরা ভালো ছিল। তাঁর সম্পর্কে কেউ খারাপ কিছু বলবেন, এমনটা তিনি দেখেননি। দেশে থাকাকালে নজরুলের আচরণে এ ধরনের কোনো কিছু তাঁর চোখে পড়েনি বলেও জানান তিনি।

ছেলের মরদেহ দেখতে চান বাবা-মা

সোমবার সকালে নজরুলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা আবদুল বাছিরের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কেঁদে ফেলছিলেন তিনি।

আবদুল বাছির বলেন, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিলেন। প্রথম সাত-আট মাসে নজরুল প্রায় দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে তিনি সৌদি আরবের কারাগারে ছিলেন। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর তাঁর বোনও হঠাৎ হৃদ্‌রোগে মারা গেছেন।

এখন ছেলের মরদেহ একবার দেখার অপেক্ষায় আছেন বলে জানান আবদুল বাছির।

ছেলেকে হারানোর শোকে কয়েক দিন ধরে কাঁদছেন মা রহিমা বেগমও। তিনি বলেন, ছেলে এক মাস পরপর ফোন করত। তখন এক থেকে দুই মিনিট কথা বলার সুযোগ হতো। তাঁর দাবি, ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখতে চান তিনি।