বিশ্বের আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো মৃত্যুদণ্ড ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই উদ্যোগ ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক।
২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে নিজের ১৩ জন নিরস্ত্র সহযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত সাবেক মার্কিন সেনা মেজর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এমন প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, যা দেশটির বিচারব্যবস্থায় নজিরবিহীন।
প্রতিরক্ষা বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি অনলাইনে সম্প্রচার করা হবে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের মতে, এমন জঘন্য অপরাধের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা মানুষের স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তিনি জানান, হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সেনাসদস্যরা ফায়ারিং স্কোয়াডে উপস্থিত থাকবেন এবং এমন ব্যবস্থাই হওয়া উচিত।
হাসান শেষ কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন কি না কিংবা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে আবেদন জানিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিষয়টি গুরুত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, ‘আমি এগুলোর পরোয়া করি না, আগামী ৩ ডিসেম্বর আমরা তার মুখোমুখি হব।’ পেন্টাগনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রস্তাবে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি ইন্টারনেটে সম্প্রচারের সিদ্ধান্তকে নজিরবিহীন ও আইনি জটিলতায় পূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, প্রকাশ্যে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেখানো অত্যন্ত ঘৃণ্য। এটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইসিসের বর্বর কর্মকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকও এমন পদক্ষেপকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ফোর্ট হুডের ওই হামলায় সাতটি গুলির আঘাত সহ্য করে বেঁচে যাওয়া সাবেক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট আলোনজো লুনসফোর্ড মনে করেন, হাসানের অপরাধের জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ডই সবচেয়ে উপযুক্ত সাজা। তবে শিশুদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে প্রকাশ্যে সরাসরি সম্প্রচারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে হামলায় নিহত ও বেঁচে যাওয়া সেনাসদস্যদের পরিবারের সদস্যদের কোনো ধরনের সেন্সর ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য দেখার অধিকার থাকা উচিত বলে মত দিয়েছেন লুনসফোর্ড।
তিনি আরও জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় নিজে উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করছেন। গুলি ছোড়ার মুহূর্তে তিনি চান, হাসান যেন তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারেন যে হাসান পরাজিত হয়েছেন, অথচ তিনি এখনো বেঁচে আছেন।
আইনি দিক তুলে ধরে ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় সাধারণ সাক্ষী ও সাংবাদিকদের উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা থাকলেও ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচারের নজির নেই। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ এমন এক ধরনের স্বচ্ছতা সামনে আনবে, যা দেশটিতে আগে দেখা যায়নি। এতে মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা এর বাস্তব রূপ দেখতে পারবেন। তবে একই সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘন এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে।
অন্যদিকে আইনজীবী জন মিলসের মতে, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনো সুপ্রিম কোর্ট বা ফেডারেল পর্যায়ে পুরোপুরি শেষ হয়নি। উচ্চ আদালতে আবেদন করা হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশও আসতে পারে। এ কারণে তিনি সরাসরি সম্প্রচারের উদ্যোগকে ট্রাম্প প্রশাসনের নিছক ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সাবেক এই মার্কিন সেনা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ২০১৩ সালে সামরিক আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। সে সময় তিনি দাবি করেন, আফগানিস্তানে তালেবান ও মুসলিমদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই নিজের ঘাঁটির চিকিৎসা ভবনে নিরস্ত্র সহযোদ্ধাদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী, এ ধরনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং উচ্চ আদালতে আপিল পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৭টি দেশে ২ হাজার ৭০০টির বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে ইরান ও আফগানিস্তানেই কেবল জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা দেখা গেছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশগুলোর মধ্যে চীন, ইরান, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের পর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ১৭ বছরের বিরতি ভেঙে একযোগে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবার ক্ষমতায় ফিরে তিনি জো বাইডেনের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ ১৯৬১ সালে ধর্ষণের দায়ে এক সেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। এক অস্ট্রীয় কিশোরীকে ধর্ষণের ওই ঘটনায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার অনুমোদন দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে। সে সময় এক দলত্যাগী সেনাকে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় পর টেক্সাসের ফোর্ট হুডে আগামী ৩ ডিসেম্বর মেজর নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীর ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা হবে। একই সঙ্গে এর দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত দেশটির বিচারব্যবস্থা ও মৃত্যুদণ্ড প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।