গ্রামীণ কল্যাণের কাছে বকেয়া কর বাবদ পাওনা ৬৬৬ কোটি টাকা যত দ্রুত সম্ভব আদায়ের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাঁচটি করবর্ষের কর পুনর্মূল্যায়ন ও কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটির করা দুটি রিট খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায় দুটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করেন। একটি রায় ১৫ পৃষ্ঠার এবং অন্যটি ৩২ পৃষ্ঠার।
৩২ পৃষ্ঠার রায়ের শেষাংশে আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্য রায়েও বকেয়া করের বিষয়ে নোটিশ জারিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানও ছিলেন।
২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭—এই পাঁচ করবর্ষে প্রদেয় কর পুনর্মূল্যায়নের পর ৬৬৬ কোটি টাকার দাবি ওঠে। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে পৃথক দুটি রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটি চুক্তির আওতায় গ্রামীণফোনে বিনিয়োগ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ওই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাওয়ার কথা গ্রামীণ কল্যাণের। তবে এ অর্থ লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য হবে, নাকি অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
কর কর্তৃপক্ষের অবস্থান ছিল, গ্রামীণ কল্যাণের পাওয়া অর্থ প্রকৃতপক্ষে সুদ বা বিনিয়োগ থেকে অর্জিত আয়। তাই একে লভ্যাংশ আয় হিসেবে বিবেচনা না করে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করতে হবে।
এর আগে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের অন্য একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন। তবে একই বছরের ২৯ আগস্ট ওই বেঞ্চ রায় প্রত্যাহার করেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ কারণে রায়টি ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। পরে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে এক আদেশে মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। এরপর ওই বেঞ্চে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
যে কারণে রিট খারিজ
রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সামাদ আজাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় গ্রামীণ কল্যাণ থেকে অর্থ বিনিয়োগ, ঋণ বা আর্থিক সহায়তা হিসেবে গ্রহণ করে গ্রামীণ টেলিকম। ওই অর্থ ব্যবসায় বিনিয়োগের মাধ্যমে যে মুনাফা অর্জিত হয়, তার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাওয়ার কথা গ্রামীণ কল্যাণের। এ আয়ের ওপর কার কর আরোপের দায়িত্ব এবং কী হারে কর দিতে হবে, তা নিয়েই মূলত বিরোধের সূত্রপাত।
তিনি জানান, দুটি প্রতিষ্ঠান কোম্পানি আইনে পৃথক আইনগত সত্তা। ফলে তাদের আয়করও আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আয়কর অধ্যাদেশের ১২০(১) ধারার উল্লেখ রয়েছে। এ ধারায় অধস্তন কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ উপকর কমিশনারের দেওয়া কোনো ভুল আদেশ সংশোধনের ক্ষমতা পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনারকে দেওয়া হয়েছে।
আবদুস সামাদ আজাদের ভাষ্য, শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য গ্রামীণ কল্যাণকে যথাযথভাবে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। শুনানি শেষে পরিদর্শী অতিরিক্ত কর কমিশনার সিদ্ধান্ত দেন, গ্রামীণ কল্যাণের দাবি করা লভ্যাংশ আয়কে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করে কর নির্ধারণ করা হবে। ২০১৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়ে এ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
রায়ে বলা হয়েছে, গ্রামীণফোনে বিনিয়োগের সূত্রে অর্জিত আয়ের ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ অংশ হিসেবে গ্রামীণ কল্যাণ যে মুনাফা পেয়েছে, তা লভ্যাংশ আয় নয়; বরং অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে বিবেচ্য।
ওই আয়ের বিপরীতে গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি এবং গ্রামীণ কল্যাণের নামে সরকারি কোষাগারে কর জমা দেওয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইন কর্মকর্তা। তাঁর মতে, আয়কে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করে কর নির্ধারণে কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত বেআইনি নয়। এ কারণে আয়কর অধ্যাদেশের ১২০ ধারায় শুরু করা কার্যক্রমও বৈধ বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে গ্রামীণ কল্যাণ কর কমিশনারের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। তবে আয়কর অধ্যাদেশের ১২১এ(৪)(খ) ধারায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী স্বীকৃত করদায় পরিশোধ না করায় সেই আবেদনও খারিজ হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট রিট দুটি খারিজ করেন।
রায়ের প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার পর উপকর কমিশনার পাঁচটি করবর্ষের বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ের জন্য গ্রামীণ কল্যাণকে নোটিশ দেবেন বলে জানিয়েছেন আবদুস সামাদ আজাদ। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব এ নোটিশ জারি করতে হবে বলে জানান তিনি।
আপিল করবে গ্রামীণ কল্যাণ
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রামীণ কল্যাণ। প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, রায় স্থগিত চেয়ে ইতিমধ্যে আবেদন করা হয়েছে। রায়ের প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার পর আপিল করার অনুমতি চেয়ে লিভ টু আপিল দায়ের করা হবে।
আবদুল্লাহ আল মামুনের ভাষ্য, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে গ্রামীণফোনের শেয়ার কেনা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে অর্থ দেয় গ্রামীণ কল্যাণ এবং বিনিয়োগ পরিচালনার দায়িত্ব ছিল গ্রামীণ টেলিকমের। চুক্তি অনুযায়ী, দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মুনাফা ভাগাভাগি হতো।
তিনি জানান, ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এভাবে কার্যক্রম চলেছে এবং তা কর কমিশন অনুমোদন করেছিল। যৌথ বিনিয়োগ থেকে পাওয়া লভ্যাংশের ওপর কর দেওয়া হয়েছে। গ্রামীণফোন লভ্যাংশ দেওয়ার সময় অগ্রিম কর কেটে রাখত।
তবে ২০১৭ সালে কর কর্তৃপক্ষ গ্রামীণ কল্যাণের আয়ের ওপর পরিদর্শন চালিয়ে ওই অর্থকে অন্যান্য উৎস থেকে আয় হিসেবে গণ্য করে করযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত দেয়। গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীর দাবি, ওই আয়ের বিপরীতে কর আগেই পরিশোধ করা হয়েছিল। ফলে নতুন করে কর দাবি করা হলে তা দ্বৈত কর আরোপের শামিল হবে।
এই যুক্তিতেই রিট দুটি করা হয়েছিল বলে জানান আবদুল্লাহ আল মামুন।