নতুন করে হামলার প্রস্তুতি হিসেবে ইরানের সীমান্ত পর্যন্ত যুদ্ধবিমান নিয়ে গিয়ে সামরিক মহড়া চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের জ্বালানি, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোয় স্বল্প সময়ের মধ্যে তীব্র হামলার পরিকল্পনা করছে দেশ দুটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও নিউইয়র্ক টাইমস।
গত সোমবার কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান নিয়ে সামরিক মহড়া চালায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। যুদ্ধবিমানগুলোর উড্ডয়নপথ সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল থেকে ৮০০ মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে সিরিয়া ও ইরাকের আকাশসীমা অতিক্রম করে ইরান সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছায় যুদ্ধবিমানগুলো। পরে সেখান থেকে ফিরে আসে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় নতুন করে হামলার পরিকল্পনা করছে দেশ দুটি। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের তেহরানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত অভিযান স্বল্পস্থায়ী হলেও অত্যন্ত তীব্র হতে পারে। এতে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মকর্তাদের ধারণা, আরও এক দফা বড় ধরনের হামলা চালানো হলে ইরানের অর্থনীতি গুরুতর সংকটে পড়তে পারে। এর ফলে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে তেহরানকে বিভিন্ন বিষয়ে ছাড় দিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
নির্বাচনের আগে হামলায় ট্রাম্পের আপত্তি
চলতি অক্টোবরের শুরুতে ইরানে হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের আগে নতুন করে সংঘাত শুরু করতে আগ্রহী না হওয়ায় সেই অভিযান এগোয়নি।
ইসরায়েলের বিরোধী শিবিরের কয়েকজন নেতার আশঙ্কা, আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় দেশটির নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার অজুহাত হিসেবে সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন নেতানিয়াহু। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত একটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের চেয়ে ১২ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছেন তিনি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নভেম্বরের আগে অভিযান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমন আশঙ্কাও রয়েছে, নির্বাচনে হেরে গেলেও সামরিক অভিযান চালাতে পারেন নেতানিয়াহু। নতুন সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলার সময় তিনি অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকবেন।
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সম্ভাব্য নতুন অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। নভেম্বরের শুরুতে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত থাকার লক্ষ্য নিয়ে ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্ট এবং উভচর সামরিক জাহাজের বহর ইউএসএস মাকিন আইল্যান্ড।
সোমবার ইসরায়েল সফরে গিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে হামলা চালালে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া সমুদ্রের নিচের ইন্টারনেট কেবল বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়েছে ইরান। এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আর্থিক লেনদেন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র জেনারেল হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, হামলার ‘তৃতীয় পর্যায়’ শুরু হওয়ার আগেই ইরান যুদ্ধের ‘নতুন ভূগোল’ প্রকাশ করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া যোগাযোগের কেবলগুলো এখন ‘বৈধ নতুন লক্ষ্যবস্তু’।
এসব কেবল বিচ্ছিন্ন করা হলে আর্থিক বাজার, ব্যাংকের লেনদেন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামগ্রিক ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি করতে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। তাঁর দাবি, দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার নেতৃত্ব কোনোভাবেই ট্রাম্পকে রাজনৈতিক জয় এনে দিতে চায় না।