শুক্রবার, 23 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সাজেকে সংঘর্ষের পরও অবরোধ, বন্ধ পর্যটনকেন্দ্র

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এখনো কাটেনি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে নিরাপত্তা দিয়ে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সাজেকে সংঘর্ষের পরও অবরোধ, বন্ধ পর্যটনকেন্দ্র

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এখনো কাটেনি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) অবরোধকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধাওয়া-পালটা ধাওয়া ও সংঘর্ষের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে নিরাপত্তা দিয়ে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে জেলা প্রশাসন। এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে একটি সংগঠন। এতে পাহাড়ি অঞ্চলের পর্যটন, জনজীবন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

যেভাবে উত্তপ্ত হলো সাজেক

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ শুরু করে। সাজেক থেকে একটি চিহ্নিত গোষ্ঠীর সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ তিন দফা দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

অবরোধের কারণে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপুলসংখ্যক পর্যটক আটকা পড়েন। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের নিরাপত্তায় পর্যটকদের সাজেক থেকে খাগড়াছড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে পর্যটকবাহী গাড়িবহর বাধার মুখে পড়ে। ব্যারিকেড সরিয়ে পর্যটকদের এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং অবরোধকারীদের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় ২ হাজার ৯৩৩ জন পর্যটককে নিরাপদে খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়া হয়।

অবরোধের নেপথ্যে কী

অবরোধকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এসব সদস্যকে সরিয়ে স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। সংগঠনটির দাবি, সাজেককে কেন্দ্র করে তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাদের দলে কোথাও সশস্ত্র সদস্য বা সশস্ত্র কার্যক্রম নেই বলে দাবি করেছেন সংগঠনটির সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা। তিনি বলেন, তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তাঁর অভিযোগ, ইউপিডিএফ পাহাড়ে সন্ত্রাসী রাজত্ব বিস্তার করছে।

অন্যদিকে, অবরোধকারী সংগঠনগুলোকে বিভিন্ন মহল থেকে ইউপিডিএফ-ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, কারা গুলি চালিয়েছে এবং কীভাবে সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্ধ পর্যটনকেন্দ্র, ক্ষতির মুখে স্থানীয় ব্যবসা

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন।

এতে পর্যটননির্ভর রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি সড়ক অবরোধের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন এবং জুমের ফসল বাজারজাতকরণও ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

২৪ অক্টোবর দুই জেলায় অবরোধের ডাক

সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। সংগঠনটি শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে আধাবেলা সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে। এ কর্মসূচিকে ঘিরে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় বিভিন্ন মহল মনে করছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অবরোধ প্রত্যাহার, বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, সংঘর্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতেও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অভিযোগ-পালটা অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সাজেকের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর জনশূন্য গঙ্গারাম

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর সাজেকের গঙ্গারাম এলাকায় জনশূন্যতা দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে সাধারণ মানুষ বাড়িঘর ও দোকানপাট ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন বলে জানিয়েছেন সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা।

তিনি জানান, শুক্রবারও সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ অব্যাহত ছিল। সকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে সড়কে টায়ার ও গাছের গুঁড়ি জ্বালিয়ে কর্মসূচি পালন করা হয়। অবরোধের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও শুক্রবার কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

গোলাগুলি নিয়ে পালটাপালটি বক্তব্য

বৃহস্পতিবার সকালে আটকে পড়া পর্যটকদের খাগড়াছড়িতে সরিয়ে নেওয়ার সময় গঙ্গারাম উজোবাজার এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলি হয়।

সেনাবাহিনীর দাবি, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা গুলি চালালে আত্মরক্ষার্থে পালটা গুলি চালানো হয়। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইউপিডিএফ। সংগঠনটির দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী একতরফাভাবে গুলি চালিয়েছে।

এ ছাড়া অবরোধকারীদের ওপর হামলা, লাঠিচার্জ এবং ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দিয়েছে ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ। অন্যদিকে, স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন।

এ পরিস্থিতিতে সাজেকে পর্যটন কার্যক্রম ও স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা এবং পণ্য পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে: পুলিশ সুপার

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আবদুর রকিব জানিয়েছেন, বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে।

এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।