ফ্রান্সে সপ্তাহান্তে ব্যাপক সহিংসতা, দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় দায় স্বীকার করে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। তবে তাঁর সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। একই সঙ্গে বিক্ষোভ ও লুটপাট মোকাবিলায় দ্রুত নতুন কৌশল প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
সোমবার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিসি প্রাসাদের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি ও ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকায় রোববার মাখোঁর কাছে পদত্যাগের প্রস্তাব দেন নুনেজ। ফ্রান্স ইন্টার বেতারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মাঠপর্যায়ে ঘটে যাওয়া সবকিছুর দায় তিনি নিজের কাঁধে নিচ্ছেন।
নুনেজ জানান, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর জন্য নিজেকে দায়ী মনে করেই তিনি পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল বলেও স্বীকার করেন তিনি। এ ছাড়া সহিংসতা মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের ক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল বলে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অন্যদিকে, সহিংসতার ব্যাপকতা বৃদ্ধির পেছনে আগাম প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন মাখোঁ। এ বিষয়ে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
এলিসি প্রাসাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটের মধ্যে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নেতৃত্ব এবং নির্দেশনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে নুনেজকে দায়িত্বে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। পাশাপাশি লুটপাটকারীদের মোকাবিলায় যত দ্রুত সম্ভব নতুন কৌশল তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জনসেবা খাতের দুর্বলতা এবং বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি নিয়ে জনসাধারণের ক্ষোভ থেকে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত। গত মাসে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শনিবারের বিক্ষোভে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সহিংস গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়। একটি টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়, দোকানপাটে লুটপাট চলে এবং বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হয়।
শনিবারের বিক্ষোভের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। রোববার প্যারিস ও মার্সেইয়ে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের চেষ্টা ঠেকাতে দাঙ্গা পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকার কাছে নতুন করে সহিংসতার পর মধ্যরাত নাগাদ ৯২ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত প্যারিসে ৩৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিক্ষোভে প্রায় এক হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন।
সহিংসতা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাও সমালোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিস, মার্সেই ও লিমোজ শহরের মেয়েরাও রয়েছেন।
সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর একটি মার্সেই সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের। কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, শনিবার সেখানে লুটপাটে ৩০ হাজার পর্যন্ত মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
এদিকে, রোববার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাখোঁ। তিনি বলেন, যারা প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁদের জবাবদিহি করতে হবে। এসব ঘটনায় দেশজুড়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও লজ্জা তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার রাতেও প্যারিস, লিওঁ ও মার্সেইয়ে নতুন করে সংঘর্ষ ও লুটপাটের খবর পাওয়া যায়। সহিংসতার কারণে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বাণিজ্য ও বিতরণ খাতের সংশ্লিষ্ট সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, শনিবারের সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসব ঘটনার অর্থনৈতিক প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি পর্যালোচনায় স্থানীয় সময় সোমবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় পর্যায়ের একটি সংকটকালীন বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা এ বৈঠকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি, বিমাসংক্রান্ত বিষয় এবং চলমান আইনি কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা।