যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেস সদস্যদের কার্যালয় ও নির্বাচনী দপ্তরে ডাকযোগে পাঠানো চিঠিতে রহস্যময় গুঁড়াজাতীয় পদার্থ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই। আইনপ্রণেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে অন্তত ৩৬ জন আইনপ্রণেতা তাঁদের কার্যালয়ে রহস্যময় চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কয়েকটি চিঠিতে সাদা গুঁড়ার মতো পদার্থ ছিল। চিঠি খোলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি কার্যালয় খালি করা হয় এবং ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান নেন।
বৃহস্পতিবার সিনেটের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস দপ্তর থেকে ক্যাপিটল হিলের কর্মীদের পাঠানো এক ই-মেইলে এসব তথ্য জানানো হয়। ই-মেইলটিতে বলা হয়েছে, কংগ্রেস সদস্যদের কার্যালয়ে পাঠানো চিঠিগুলোর তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্রের ডাক পরিদর্শন বিভাগ (ইউএসপিআইএস), এফবিআই ও ক্যাপিটল পুলিশ।
এদিকে চলতি সপ্তাহে অন্তত ১০টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী দপ্তরেও সাদা গুঁড়ার মতো রহস্যময় পদার্থযুক্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে। এসব ঘটনার তদন্ত করছে এফবিআই ও যুক্তরাষ্ট্রের ডাক পরিদর্শন বিভাগ।
কংগ্রেস সদস্যদের কার্যালয় এবং নির্বাচনী দপ্তরে পাঠানো চিঠিগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অন্তত ছয়টি ঘটনায় চিঠিতে থাকা পদার্থকে ক্ষতিকর নয় বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
বুধবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এফবিআই জানায়, দেশজুড়ে বিভিন্ন ঠিকানায় রহস্যময় চিঠির একটি ধারাবাহিক চালান পাঠানো হয়েছে। এসব ঠিকানার মধ্যে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সেক্রেটারি অব স্টেটের দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কার্যালয়ও রয়েছে।
বিবৃতিতে এফবিআই জানায়, কিছু চিঠিতে অজ্ঞাত পদার্থ পাওয়া গেছে। প্রতিটি ঘটনায় সাড়া দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে সংস্থাটি। পাশাপাশি এসব চিঠি পাঠানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার রাত পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় দলের অন্তত ৩৬ জন কংগ্রেস সদস্য তাঁদের কার্যালয়ে রহস্যময় চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত সাতটি চিঠি খোলা হয়েছিল। পরে সংশ্লিষ্ট কার্যালয় খালি করে পদার্থ পরীক্ষা করা হয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আরও কয়েকটি কার্যালয় খালি করা হয়। তবে অনেক চিঠি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আটকানো হয়েছে।
সিনেটের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস দপ্তরের ই-মেইলে বলা হয়েছে, চিঠিগুলো গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আটকে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। তবে কিছু চিঠি এরই মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, হিউস্টনে তাঁর কার্যালয়ে সাদা গুঁড়ার মতো পদার্থযুক্ত একটি রহস্যময় চিঠি এসেছে। তিনি বলেন, ঘটনাটি গভীর উদ্বেগজনক। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য নয়।
মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সের একজন মুখপাত্র জানান, চলতি সপ্তাহে তাঁর দুটি কার্যালয়ের ঠিকানায় রহস্যময় চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে চিঠি দুটি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই আটকানো হয়।
কলিন্সের চিফ অব স্টাফ কেটি ব্রাউন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পোর্টল্যান্ড পুলিশ, পোর্টল্যান্ড ফায়ার ডিপার্টমেন্ট, বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলায় নিয়োজিত দল ও এফবিআইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, গত দুই মাসে সিনেটর কলিন্সের কার্যালয় বা বাসভবনকে লক্ষ্য করে এটি চতুর্থ হামলা।
ডেমোক্রেটিক সিনেটর ও দলের সিনেট নির্বাচনী কমিটির প্রধান কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান, নিউইয়র্ক শহরে তাঁর কার্যালয়ের ঠিকানায় একটি রহস্যময় চিঠি পাঠানো হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ডাক পরিদর্শন বিভাগ সেটি আটক করেছে।
জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেট ব্র্যাড রাফেন্সপার্গারের এক মুখপাত্র জানান, ডাক বিভাগ ডেমোক্রেটিক সিনেটর রাফায়েল ওয়ার্নক এবং রাফেন্সপার্গারের কার্যালয়ের ঠিকানায় পাঠানো রহস্যময় চিঠিও আটক করেছে।
ক্যাপিটল হিলের কর্মীরা যাতে এ ধরনের চিঠি শনাক্ত করতে পারেন, সে জন্য সিনেটের সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস দপ্তরের ই-মেইলে রহস্যময় একটি খামের ছবিও যুক্ত করা হয়েছিল।
অন্যদিকে অ্যারিজোনার সেক্রেটারি অব স্টেট অ্যাড্রিয়ান ফন্টেস জানান, বৃহস্পতিবার অঙ্গরাজ্যের ক্যাপিটল কমপ্লেক্সে কর্মীরা সাদা গুঁড়াভর্তি একটি খাম খোলার পর সেখানকার দপ্তরগুলো খালি করা হয়। ওই পদার্থের সংস্পর্শে আসা কর্মীদের আলাদা করে রাখা হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিপজ্জনক পদার্থ মোকাবিলায় নিয়োজিত দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
শুক্রবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ফন্টেস বলেন, সংগৃহীত পদার্থটি আগের রাতে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রথমে এর বিষাক্ততা যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় বিষাক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে পদার্থটি আসলে কী, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এই মুহূর্তে পদার্থটিকে মানুষের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করা হচ্ছে না।
ফন্টেস আরও বলেন, নির্বাচনের ব্যস্ত সময়ে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটানো এবং ভোটারদের ভয় দেখানোর সম্ভাবনাও ক্ষতিকর। এটি গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য হুমকি। ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া উচিত।
লুইজিয়ানা ও ওকলাহোমার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তাঁদের অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী দপ্তরেও এ ধরনের চিঠি পৌঁছেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর দপ্তরগুলো খালি করা হয়।
জর্জিয়া, মিসিসিপি, মেরিল্যান্ড ও ওহাইওর নির্বাচনী কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে তাঁদের দপ্তর লক্ষ্য করে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার আগেই আটকানো হয়।
উইসকনসিন নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানায়, চলতি সপ্তাহে তারা রহস্যময় চিঠি পেয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর পদার্থটিকে বিপজ্জনক নয় বলে জানানো হয়েছে। নেব্রাস্কার সেক্রেটারি অব স্টেটের দপ্তরও একটি রহস্যময় খাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে। বৃহস্পতিবারের বিবৃতি অনুযায়ী, খামটি খোলা হয়নি; সেটি এফবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সেক্রেটারিজ অব স্টেট এবং ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেট ইলেকশন ডিরেক্টরস এক যৌথ বিবৃতিতে ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংগঠন দুটি জানায়, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে হুমকি গণতন্ত্রে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকা উচিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে রহস্যময় বা হুমকিমূলক চিঠি আসার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে অন্তত ছয়টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে গুঁড়াযুক্ত প্যাকেট পাঠানো হয়েছিল।
চলতি সপ্তাহের ঘটনাগুলো আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাইবার হামলা থেকে শুরু করে শারীরিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে। এমন মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের গোয়েন্দা ও বিশ্লেষণবিষয়ক সাবেক ভারপ্রাপ্ত আন্ডার সেক্রেটারি জন কোহেন।
কোহেন বলেন, হুমকির ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এগুলো গতিশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও বিপজ্জনক। তবে এসব হুমকি মোকাবিলায় অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রস্তুত রয়েছেন।