মঙ্গলবার, 27 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় পতনের মুখে ভারতের শেয়ারবাজার

ভারতের শেয়ারবাজারে চলতি বছর বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। ব্যাপক বিক্রির চাপে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি রুপি কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে খারাপ বার্ষিক পারফরম্যান্সের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশটির শেয়ারবাজারে।

২০০৮ সালের পর সবচেয়ে বড় পতনের মুখে ভারতের শেয়ারবাজার

ভারতের শেয়ারবাজারে চলতি বছর বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। ব্যাপক বিক্রির চাপে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি রুপি কমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে খারাপ বার্ষিক পারফরম্যান্সের মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দেশটির শেয়ারবাজারে।

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চলতি বছর ভারতের প্রধান শেয়ারসূচক নিফটি ৫০ প্রায় ১৪ শতাংশ কমেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অন্তত ১৮ বছরের মধ্যে সূচকটির সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন হতে পারে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়াকে বাদ দিলে চলতি বছর বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে ভারত।

দীর্ঘদিন ধরে ভালো পারফরম্যান্সের কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের শেয়ারবাজার আকর্ষণীয় ছিল। তবে চলতি বছরের দরপতনে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। এরই মধ্যে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা (এফআইআই) ভারতের বাজার থেকে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার বা ৩ লাখ কোটি রুপির বেশি তুলে নিয়েছেন। ধারাবাহিকভাবে বিদেশি অর্থ বেরিয়ে যাওয়ায় শেয়ারদরের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।

নিফটি ৫০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত ৫০টি কোম্পানির মধ্যে চলতি বছর ৩৮টির শেয়ারদর কমেছে। এর মধ্যে ২৫টি কোম্পানির দরপতন হয়েছে ১০ শতাংশ বা তার বেশি।

সূচকের বড় দরপতনের শিকার কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে আইটিসি। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর কমেছে ৩৬ শতাংশ। মারুতি সুজুকির দর কমেছে ৩৪ শতাংশ। জিও ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৩১ শতাংশ করে। এ ছাড়া এইচডিএফসি ব্যাংকের দরপতন হয়েছে ৩০ শতাংশ।

নিফটির আরও কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এতে বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও ব্যাপক বিক্রির চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বড় কোম্পানির পাশাপাশি মাঝারি ও ছোট মূলধনি কোম্পানির শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য দরপতন হয়েছে। সম্প্রতি পর্যন্ত মিডক্যাপ শেয়ারগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও গত চার কার্যদিবসে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে।

চলতি বছর নিফটি মিডক্যাপ ১০০ সূচক প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে সর্বশেষ সপ্তাহেই সূচকটির পতন হয়েছে ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

মিডক্যাপ কোম্পানিগুলোর মধ্যে কেপিআইটি টেকনোলজিসের শেয়ারদর কমেছে ৫৪ শতাংশ। আদিত্য বিড়লা ফ্যাশন অ্যান্ড রিটেইলের দর কমেছে ৫০ শতাংশ এবং পিবি ফিনটেকের ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া মুথুট ফাইন্যান্সের শেয়ারদর কমেছে ৩৮ শতাংশ এবং পিআই ইন্ডাস্ট্রিজের ৩৭ শতাংশ।

ছোট মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও একই ধরনের পতন দেখা গেছে। কেকেইসি ইন্টারন্যাশনালের দর কমেছে ৫৬ শতাংশ, ইনক্স উইন্ডের ৫২ শতাংশ এবং জুপিটার ওয়াগনসের ৪৯ শতাংশ। আইআরসিওএন ইন্টারন্যাশনালের শেয়ারদর কমেছে ৪৫ শতাংশ এবং এনবিসিসির ৪৪ শতাংশ।

মিডক্যাপ ও স্মলক্যাপ শ্রেণির আরও বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারদর চলতি বছর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে। সর্বশেষ সপ্তাহের পরিসংখ্যানেও বাজারের দুর্বল চিত্র উঠে এসেছে। নিফটি মিডক্যাপ ১০০ ও নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচকের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাত্র ছয়টির শেয়ার ইতিবাচক অবস্থানে থেকে সপ্তাহের লেনদেন শেষ করেছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন অর্থ তুলে নিচ্ছেন?

ভারতের শেয়ারবাজারে দরপতনের অন্যতম প্রধান কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক অর্থ প্রত্যাহার। গত ১ থেকে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে নিট ৪৭ হাজার ৯৫৫ কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন।

গিওটাস ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিক্রম সুব্বুরাজ বলেন, শেয়ার থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর উচ্চ কর, মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তন এবং কর-দায় নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়াচ্ছে।

তার মতে, ভারতে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ব্যয় বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে কেন্দ্রীয় বাজেটে নির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত শেয়ার থেকে অর্জিত দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি মুনাফার করহার ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে স্বল্পমেয়াদি মূলধনি মুনাফার করহার ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।

করহার বাড়ানোর ফলে শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা অর্জনের পর বিনিয়োগকারীদের হাতে আগের তুলনায় কম অর্থ থাকছে। উদাহরণ হিসেবে, করযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনি মুনাফার প্রতি ১০০ রুপিতে বর্তমানে কর দেওয়ার পর বিনিয়োগকারীর হাতে থাকে ৮৭ দশমিক ৫০ রুপি। আগে থাকত ৯০ রুপি। তবে এই হিসাবের মধ্যে অতিরিক্ত সারচার্জ ও সেস অন্তর্ভুক্ত নয়।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য রুপির বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিনিয়োগের সময় মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির দর কমে গেলে ডলারে হিসাব করার সময় তাদের প্রকৃত মুনাফার পরিমাণ কমে যায়।

তবে শুধু কর বৃদ্ধি দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিপুল অর্থ প্রত্যাহারের পুরো কারণ ব্যাখ্যা করা যায় না। বৈশ্বিক বাজারের পরিস্থিতি, শেয়ারের মূল্যায়ন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কিত প্রত্যাশাও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

সুব্বুরাজ জানান, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হেফাজতে থাকা ভারতীয় শেয়ারসম্পদের মূল্য ছিল ৬৫ লাখ ৯৪ হাজার কোটি রুপি। এসব বিনিয়োগে বিদেশিরা অর্থ বাড়াবেন, নাকি আরও কমাবেন, তার ওপরও বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ভর করছে।

কর-দায় নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

সুব্বুরাজের মতে, একটি তহবিলের মধ্যে বিনিয়োগ এক খাত থেকে অন্য খাতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কর-দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কোনো কোনো বিনিয়োগকারী অর্থ তুলে নেওয়ার পরও করের দাবির মুখে পড়তে পারেন। তহবিল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নিয়ম এবং কর-দায় নিষ্পত্তির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের উদ্বেগ কমানো সম্ভব।

তিনি বলেন, শুধু করহার কমিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। কর বাড়ানোর ফলে সরকারের রাজস্ব কতটা বাড়ছে, তার পাশাপাশি তহবিলগুলোর বাস্তব সমস্যাগুলোও পর্যালোচনা করা উচিত।

সব মিলিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্থ প্রত্যাহার, বড় ও ছোট কোম্পানির শেয়ারদরে ব্যাপক পতন এবং করসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ভারতের শেয়ারবাজারে চাপ বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সবচেয়ে খারাপ বার্ষিক পারফরম্যান্সের মুখে পড়তে পারে দেশটির শেয়ারবাজার। তবে বছর শেষে বাজারের প্রকৃত অবস্থান নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং অর্থপ্রবাহের পরিবর্তনের ওপর।