বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ পরিস্থিতি এখনো বেশ উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ সম্প্রতি তাদের 'বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫'-এর ফলাফলে জানিয়েছে, দেশের ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশেরই ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারী।
বাংলাদেশ সফর শেষে শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল। তিন দিনের এই সফর শেষে তিনি যেসব প্রস্তাব রেখেছেন, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হলো বাল্যবিবাহ রোধ করে মেয়েদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের বা জিডিপির পাঁচ শতাংশ বিনিয়োগের যে সরকারি প্রতিশ্রুতি রয়েছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা এবং রোহিঙ্গা শিশুসহ স্থানীয় শিশুদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে মেয়েদের মাঝপথে পড়াশোনা ঝরে পড়ার প্রবল শঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে তাদের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়ে, যা মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে এবং তাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশে অবস্থানকালে ক্যাথরিন রাসেল রাজধানীর কড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের পাশাপাশি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটান। সেখানে তিনি ১৪ বছর বয়সী কিশোরী বুশরার সঙ্গেও দেখা করেন, যাকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। ইউনিসেফের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি শিশু সুরক্ষা কেন্দ্রের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বুশরার বাবাকে বুঝিয়ে এই বিয়ে বন্ধ করেছিলেন বলে নিজের অভিজ্ঞতায় তুলে ধরেন ক্যাথরিন রাসেল। তিনি মনে করেন, মেয়েদের বিদ্যালয়মুখী করার পাশাপাশি তাদের জন্য যথোপযুক্ত চিকিৎসাসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তা সমাজ ও দেশের জন্য এক ইতিবাচক ভবিষ্যৎ বয়ে আনবে।
ঢাকা সফরকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও এক বৈঠকে মিলিত হন ইউনিসেফ প্রধান। এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধির সরকারি সদিচ্ছার প্রশংসা করেন এবং তা দ্রুত কার্যকরের তাগিদ দেন। তার মতে, একটি দেশের বাজেটের মাধ্যমেই তাদের মূল লক্ষ্যগুলো প্রকাশ পায়, তাই শিশুদের সুরক্ষা, শিক্ষা ও পুষ্টি খাতে ব্যয় করা মানে আসলে দেশের আগামী দিনের জন্য বিনিয়োগ করা। সবশেষে তিনি রোহিঙ্গা শিশুদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সহিংসতা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার এই শিশুদের কোনোভাবেই শিক্ষা থেকে দূরে রাখা উচিত নয়। একইসঙ্গে তিনি আশ্রয়দাতা দেশের শিশুদের জন্যও আন্তর্জাতিক মহলকে আরও বেশি আর্থিক সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।