বর্তমান প্রশাসনের পক্ষে মাত্র ছয় মাসের মাথায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সকল জটিলতার অবসান ঘটানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
একই সাথে তিনি জানান, বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটিগুলো চূড়ান্ত রূপ দেওয়াকেই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে। বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যদের নামের তালিকা পাওয়া সাপেক্ষেই কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। অধিবেশনটির স্থায়ীত্ব ৫, ৭ বা ১০ দিনের মতো সংক্ষিপ্ত হলেও আবশ্যকীয় পরিস্থিতিতে কাজের সুবিধার্থে সময়সীমা বৃদ্ধি করা হতে পারে।
বুধবার সংসদ ভবন চত্বরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন, সংসদে বিরোধীদের অবদান, শাসনতন্ত্র সংশোধন এবং আসন্ন প্রয়োজনীয় বিলসমূহ নিয়ে আলোচনার সময় চিফ হুইপ এসব মন্তব্য করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, চলতি অধিবেশনে আনুমানিক ছয়টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করা হতে পারে। এগুলোর মধ্যে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত বিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত খসড়া বিধানের ব্যাখ্যায় তিনি জানান, বাবা-মা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও নিজেদের জীবদ্দশায় তাঁরা উক্ত সম্পত্তির অধিকার ও ব্যবহার বজায় রাখতে পারবেন। এর মাধ্যমে সম্পদ পাওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের ঔদাসীন্য ও অবহেলা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জুলাই সনদ ও শাসনতন্ত্র সংস্কার বিষয়ে চিফ হুইপ জানান, জুলাই সনদের ওপর আস্থা রেখে নাগরিকরা নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। সেই অটুট জনসমর্থনের ওপর ভিত্তি করেই তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে একদম নতুন আইন তৈরি কিংবা চলমান আইনে পরিবর্তন আনা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শাসনতন্ত্রের একটি চিহ্ন বা সামান্য অক্ষরের রদবদলও সংবিধানের আধুনিকায়নের অংশ। দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধভাবে যে অঙ্গীকার করেছিল, তার প্রতিটি শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়নে প্রশাসন প্রতিশ্রুতবদ্ধ।
চিফ হুইপ জানান, সংবিধান পরিবর্তনের লক্ষ্যে ১৭ জনের একটি বিশিষ্ট কমিটি তৈরির প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। যেখানে বিএনপি হতে ৭ জন এবং জামায়াত হতে ৫ জন প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য ছোট দলগুলো থেকেও একজন করে প্রতিনিধি যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রতিপক্ষ দলগুলো সদস্য নাম চূড়ান্ত করলে তাদেরও এখানে জায়গা দেওয়া হবে। তিনি মন্তব্য করেন, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় শাসনতন্ত্র সংশোধন একটি স্বাভাবিক নিয়ম। এ প্রসঙ্গে তিনি ভারতে গত ৭৬ বছরে ১০৬ বার সংবিধান বদলের দৃষ্টান্ত সামনে আনেন।
সংসদের ভেতরে বিরোধীদের অবস্থান বিষয়ে চিফ হুইপ জানান, সরকারের ত্রুটি তুলে ধরা, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের তাগিদ দেওয়া বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব। তিনি প্রত্যাশা করেন, রাজপথে অস্থিরতা না বাড়িয়ে বিরোধী দল আমজনতার সংকট ও জাতীয় বিষয়গুলো সংসদীয় আলোচনায় তুলে ধরে সমাধান খুঁজে নেবে।
তিনি বলেন, সংসদ ছেড়ে আন্দোলনের মাধ্যমে পুনরায় স্বৈরাচারী ধারা ফিরিয়ে আনার সুযোগ কেউ তৈরি করবে না বলেই আশা করি। ১৭ বছরের কারাবাস, গুম ও অত্যাচার পেরিয়ে যে সফলতা এসেছে, সেই অবদান অন্য কারও হাতে সমর্পণ করা হবে না। আমরা চাই, বিরোধী দল সংসদে কথা বলবে, সরকারের বিচ্যুতি চিহ্নিত করবে এবং গঠনমূলক প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেবে।
তৃতীয় অধিবেশনের মাধ্যমে সংসদীয় কার্যক্রম নতুন বেগ পাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, কমিটিগুলোর সক্রিয়তা বাড়ানো এবং সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদ এবার আরও জোরালো কাজ করবে।
বর্তমান অচলাবস্থা কাটানো প্রসঙ্গে সময় প্রয়োজন বলে চিফ হুইপ মন্তব্য করেন, কোনো প্রশাসনের পক্ষে মাত্র ছয় মাসে পুরোনো জটিলতা দূর করা সম্ভব নয়। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ইচ্ছা এবং আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলেও মাত্র ছয় মাসে একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা যায় না, কারণ সব ঠিক থাকলেও অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন হয়।
তিনি জানান, বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলাসহ বড় অবকাঠামোগত সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। তাই সাধারণ মানুষকে ধৈর্য ধারণ করার ও দেশের স্বার্থে পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তার খেসারত কেবল কোনো ব্যক্তি বা দলকে দিতে হয় না, বরং রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসতে পারে।
জ্বালানি খাতের চুক্তির কথা তুলে ধরে চিফ হুইপ জানান, বিগত মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে করা নানাবিধ চুক্তি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করেছে। জবাবদিহি এড়িয়ে চলার আইন করে প্রশ্ন তোলার পথ বন্ধ করা হয়েছিল। কেন্দ্র বন্ধ থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ বিপুল অর্থ গুনে দেওয়ায় জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
আদানির সঙ্গে করা চুক্তিকে ক্ষতিকর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অসম চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে এই অর্থনৈতিক দায় থেকে মুক্ত হতে সকল পক্ষের ঐক্যবদ্ধ সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।