কক্সবাজারের উখিয়া থানাধীন ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় একটি কাঠের তৈরি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একই পরিবারের ছয় সদস্যসহ মোট দশজন পর্যটক নিহত হয়েছেন।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
জানা যায়, শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন 'টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট' নামক ওই তিনতলা স্থাপনাটিতে হঠাৎ করে আগুনের সূত্রপাত হয়। সম্পূর্ণ ভবনটি কাঠের তৈরি হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে ভেতরে অবস্থানরত অনেক পর্যটকই আর নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাননি। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন এবং ভবনের ভেতর থেকে একে একে দশটি মৃতদেহ উদ্ধার করেন।
এই অকল্পনীয় ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো একই পরিবারের ছয় সদস্য হলেন রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা, মিলিতা মেহেজাবিন আলভী, লায়লা জাহান নাবিলা, নাফিসতা মীম, ফারিহা কবির ও পাঁচ বছর বয়সী শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। পাশাপাশি এই দুর্ঘটনায় নাসরিন আক্তার মুক্তা নামের এক স্কুল শিক্ষিকাও অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তিনি ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি পদে রয়েছেন। নিহত অপর দুই পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য স্বজনদের হারিয়ে বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা আশিকুল ইসলাম একেবারেই শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার তারা ঢাকা থেকে সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে গিয়েছিলেন এবং আজই তাদের ফিরে আসার কথা ছিল। সকালে হঠাৎ আগুন দেখতে পেয়ে তার স্ত্রী তাকে জাগিয়ে তোলেন। অন্য স্বজনদের সতর্ক করতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি জানালা ভেঙে নিচে লাফিয়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারলেও স্ত্রীকে আর আগুনের গ্রাস থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেননি।
ঠিক কী কারণে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও শতভাগ নিশ্চিত নয়। তবে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের চুল্লি থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। এদিকে, এই দুর্ঘটনার পরপরই রিসোর্টটির সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ গণমাধ্যমকে জানান, স্থাপনাটির অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত কোনো ছাড়পত্র বা বৈধ অনুমোদন ছিল না। এমনকি গত জুন মাসে পরিদর্শনের পর এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সতর্কতামূলক নোটিশও প্রদান করা হয়েছিল।
কাঠের তৈরি ওই তিনতলা ভবনটির একদম নিচতলায় খাবারের হোটেল এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা ছিল, যা যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া পরিচালনা করা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। জেলা প্রশাসক আরও জানান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, প্রাণহানির নেপথ্যের গাফিলতি, ভবনটির অনুমোদন এবং জরুরি নির্গমন পথের অস্তিত্ব ছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।