পূর্ব স্পেনে মুষলধারে বৃষ্টির জেরে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যায় এখন পর্যন্ত চারজনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে কয়েক হাজার অধিবাসীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে উদ্ধারকর্মীরা। অন্যদিকে পানির তোড়ে বেশ কয়েকটি শহরের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে সোমবার স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
শনিবার আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় অ্যাডামের প্রভাবে ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের কিছু অংশে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে প্রতি বর্গমিটারে ৭০০ লিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফুলেফেঁপে ওঠা নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে সড়কগুলোকে রীতিমতো ক্ষিপ্র গতির নদীতে পরিণত করেছে, যার ফলে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী বেশ কিছু লোকালয় পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। ভয়াবহ এই দৃশ্য ভ্যালেন্সিয়াবাসীকে দুই বছর আগের সেই প্রলয়ংকরী বন্যার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যেখানে দুই শতাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্যমতে, চলমান এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে চারজন মারা গেছেন তাদের মধ্যে দুজন উপকূলীয় পর্যটন এলাকা অলিভার বাসিন্দা। বাকি দুজনের মধ্যে একজন সাগুনতোর সমুদ্রসৈকতে এবং অপরজন কাতালোনিয়া এলাকার একটি প্রবল স্রোতযুক্ত খালে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সোমবার সকালের দিকে প্রায় আট লাখ মানুষকে নিজ নিজ স্থানে সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে দিনের শেষভাগে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় এই নির্দেশনার আওতা কমিয়ে কেবল আটটি মিউনিসিপ্যালিটির ৮৭ হাজার মানুষের জন্য তা বহাল রাখা হয়। সরকারি প্রতিনিধি পিলার বের্নাবের বরাত দিয়ে জানা যায়, আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চার শতাধিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এর মধ্যে অনেকের বাড়ির চালা থেকে পানিবন্দি মানুষদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
ভয়াবহ এই ঝড়ের তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ ও কাতালোনিয়া অঞ্চলও। এসব এলাকার প্রায় একশোটি মিউনিসিপ্যালিটির বাসিন্দাদের সোমবার বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘর থেকে বের না হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। তবে বিকালের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করলে আঞ্চলিক সরকার এসব বিধিনিষেধের বেশিরভাগই প্রত্যাহার করে নেয়।
আলিকান্তের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এলস পোবলেতস এলাকায় বন্যার পানির প্রচণ্ড তোড়ে গাড়ি ও ভ্যানগুলো ভেসে গিয়ে একে অপরের ওপর স্তূপাকার হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ নিজ বসতবাড়ি থেকে যতটুকু সম্ভব ব্যবহার্য জিনিসপত্র বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। হাভিয়ের ফোরনেজ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা হতাশা প্রকাশ করে জানান, পুরো গ্রামের অবস্থা এখন চরম বিপর্যয়ের মুখে। ২০০৭ সালেও ঠিক একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হয়ে স্থানীয়রা সর্বস্ব হারিয়েছিল, আর এবারও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
সিভিল গার্ড পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সোমবার প্রধানত অলিভা অঞ্চল থেকেই দুই সহস্রাধিক মানুষকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভ্যালেন্সিয়া ও আলিকান্তেতে প্রায় একশটি উদ্ধারকাজ চালিয়েছে তারা। পেগোর মেয়র এনরিক মল সোমবার স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম আ পুন্ত রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, এখনো বহু মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় নিজেদের বাড়ির ছাদে অবস্থান করছেন এবং হেলিকপ্টারযোগে উদ্ধারের প্রহর গুনছেন। ওই শহরটিতে প্রবেশের সব রাস্তা বর্তমানে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর এইএমইটি শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কালটি ছিল স্পেনের মূল ভূখণ্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম গ্রীষ্মকাল। সেই ধারাবাহিকতায় সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসটিও দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মাস হিসেবে রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিয়েছে।
সূত্র: এইএমইটি