শুক্রবার, 6 নভেম্বর 2026
সকল বিভাগ

প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, রাস্তায় ৬ লাখ মানুষ

এবারের এই বিশাল জনসমুদ্রে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, 'ইয়েলো ভেস্ট' গোষ্ঠী এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা।

প্রতিবাদে উত্তাল ফ্রান্স, রাস্তায় ৬ লাখ মানুষ
ফ্রান্সের অর্থনীতিতে স্থবিরতা এবং বেঁচে থাকার অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলনের সাক্ষী হলো দেশটি। সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, দেশব্যাপী ডাকা এই সর্বাত্মক কর্মবিরতি ও বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার অংশ নিয়েছেন প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার সাধারণ নাগরিক।

গত ১৭ অক্টোবরের ভয়াবহ পরিস্থিতির তুলনায় এবারের আন্দোলন কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিচ্ছিন্ন সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এই সর্বাত্মক কর্মসূচির জেরে পরিবহন, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা ও রেল যোগাযোগ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

এবারের এই বিশাল জনসমুদ্রে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, 'ইয়েলো ভেস্ট' গোষ্ঠী এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা। যদিও আন্দোলনকারীদের ভিন্ন ভিন্ন দাবি রয়েছে, তবে সরকারের উদাসীনতা, শ্রেণিবৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাদের সবাইকে এক মঞ্চে দাঁড় করিয়েছে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, পরিবহন ও ডাক বিভাগের কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী বৃহৎ সংগঠনগুলোর ডাকে সাড়া দিয়ে এই দেশব্যাপী কর্মসূচি পালিত হয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর এক-তৃতীয়াংশ এবং স্কুল পর্যায়ের প্রায় ১৩ শতাংশ কর্মী এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তবে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। এদিকে রেলপথে ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিলেও, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে সরকারি হাসপাতালগুলোর মাত্র ৫ শতাংশ কর্মী কাজ থেকে বিরত থাকায় চিকিৎসা খাতে খুব একটা প্রভাব পড়েনি।

প্রায় তিন সপ্তাহ আগের সংঘাতময় পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে ফরাসি প্রশাসন ও ব্যবসায়ী মহল আগে থেকেই বাড়তি সতর্কতায় ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্সেই, লিঁও, নান্টেস এবং রেন-এর মতো শহরগুলোতে উগ্র ও অতি-বামপন্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি বড় ধরনের অঘটন ছাড়াই পার হয়েছে। সারা দেশে অভিযান চালিয়ে সংঘাতের অভিযোগে অন্তত ৪৪৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

লিঁও শহরে পরিচয় গোপন রাখা বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। রেন শহরে বেশ কিছু বিশৃঙ্খলাকারী একটি হোটেলে ভাঙচুর চালায় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট নিক্ষেপের পাশাপাশি সাধারণ আন্দোলনকারীদের ওপরও সহিংস হামলা চালায়। শিক্ষামন্ত্রী এদুয়াঁদ গেফ্রে জানিয়েছেন যে তুলুজ এলাকার একটি স্কুলে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে, যা পরিকল্পিত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। দেশজুড়ে এমন অন্তত ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কাজ করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।

কঠিন এই পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ। তিনি জানান, নানা উসকানি ও সংঘাতের চেষ্টার মধ্যেও পুলিশ চরম সাহস ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে তাদের প্রতিবাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছেন।

রাজপথে নামা বিভিন্ন পক্ষের দাবিগুলোর মধ্যে বৈচিত্র্য রয়েছে। বেতন ও পেনশন বৃদ্ধির দাবিতে সোচ্চার প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী সংগঠন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর জোর দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সিএফডিটি তাদের কর্মীদের মাসিক বেতন কমপক্ষে একশ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে।

শিক্ষার্থীরা চাইছেন শিক্ষা খাতে দশ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত বাজেট, অবকাঠামো উন্নয়নে দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আড়াই লাখ নতুন আসন সৃষ্টি করা হোক। এর পাশাপাশি, আট বছর ধরে চলা 'ইয়েলো ভেস্ট' আন্দোলনকারীরা সরাসরি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারের পদত্যাগ ও নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরুর একদফা দাবি জানিয়েছেন।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ধারণা করা হচ্ছে, আসছে বড়দিন এবং আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এই অস্থিরতা বজায় থাকতে পারে। ইয়েলো ভেস্ট গোষ্ঠীর টানা কর্মসূচির পাশাপাশি এই প্রতিবাদের ঢেউ এখন ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়াচ্ছে। চলতি মাসের শেষ ভাগে স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামতেও অনুরূপ বড় ধরনের ধর্মঘটের পরিকল্পনা চলছে।

অক্টোবরের অপ্রত্যাশিত সংঘাতের পর ফরাসি কর্তৃপক্ষ এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পুলিশ রাস্তায় কড়া পাহারা দিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখলেও, সাধারণ মানুষের যৌক্তিক দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ চরম সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগোদেক্রিপ্ট-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেন, তিনি ছুটির পর সব হাইস্কুল খোলা দেখতে চান কারণ এটি তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সরকার তরুণদের দাবিগুলো ইতোমধ্যে শুনেছে উল্লেখ করে তিনি বিক্ষোভের পাশাপাশি অন্তত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে চালুর জন্য সবার প্রতি শান্ত থাকার আবেদন জানান।

সূত্র: সিএনএন