শুক্রবার, 16 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

গ্রেনেড বিস্ফোরণে কিশোরের অঙ্গহানি, তীব্র ক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্সের শিক্ষাঙ্গন

পুলিশ সদস্যদের নিক্ষেপ করা ওই গ্রেনেডটি হাতে তুলে নেওয়ার ফলেই বিস্ফোরণ ঘটে এবং ছেলেটির বাঁ হাতটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে লিলের একটি বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

গ্রেনেড বিস্ফোরণে কিশোরের অঙ্গহানি, তীব্র ক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্সের শিক্ষাঙ্গন
শ্রেণিকক্ষের বেহাল দশা, শিক্ষক স্বল্পতা, অতিরিক্ত পাঠদানের চাপ এবং শিক্ষা কাঠামোর বৈষম্যের প্রতিবাদে ফ্রান্সে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করে রক্তক্ষয়ী রূপ নিয়েছে। দেশটির উত্তরাঞ্চলের লঁস শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া একটি স্টান গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর তা বিস্ফোরিত হয়ে পনেরো বছর বয়সী এক স্কুলপড়ুয়ার হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গোটা ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই দেশটির আরেক শহরে পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে ষোলো বছর বয়সী অন্য এক শিক্ষার্থীর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে।

লঁস নগরীর অগুস্ত বেহাল উচ্চবিদ্যালয়ের সন্নিকটে সোমবার, ৫ অক্টোবর সকালে ওই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে আঞ্চলিক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফ্রাঁসোয়া-জাভিয়ের লশ জানান, ওই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর চরমভাবে জখম হয়েছে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা ভোয়া দ্যু নোরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর ফেলা একটি বিস্ফোরক সে মাটি থেকে তুলতেই তা সশব্দে ফেটে যায়।

প্যারিসভিত্তিক দৈনিক লা প্যারিসিয়াঁ তাদের তদন্তভিত্তিক তথ্যে জানিয়েছে, পুলিশ সদস্যদের নিক্ষেপ করা ওই গ্রেনেডটি হাতে তুলে নেওয়ার ফলেই বিস্ফোরণ ঘটে এবং ছেলেটির বাঁ হাতটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে লিলের একটি বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়।

এমন এক মুহূর্তে এই দুর্ঘটনাটি ঘটল, যখন সমগ্র ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সপ্তাহের প্রথম দিনেই দেশটির মোট ৩ হাজার ৭০০ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে চার শতাধিক থেকে পাঁচ শতাধিক স্কুল পুরোপুরি কিংবা আংশিকভাবে তালাবদ্ধ রাখতে হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সোমবার সকাল নাগাদ ৪১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিক্ষোভ ও অবরোধের মুখে পড়ে; যার সংখ্যা শুক্রবার একই সময়ে ৫৬৪টিতে পৌঁছেছিল। অন্তত ২৪টি ভবনে অগ্নিসংযোগ বা ভাঙচুরের মতো নাশকতা হয়েছে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে জখম হয়েছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ৭৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী।

ক্ষোভের মূলে ভগ্নপ্রায় শিক্ষাব্যবস্থা

চলমান এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিসের পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলের তীব্র শিক্ষক সংকটকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীতে তা জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনরতদের মূল ক্ষোভ, প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকরা অনুপস্থিত থাকলে দীর্ঘ সময়েও কোনো বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় না। এর ফলে ফাইনাল পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবর্ষেও মাসের পর মাস কোনো পাঠদান ছাড়াই পার করতে হচ্ছে বহু শিক্ষার্থীকে।

এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, দীর্ঘ সময়ব্যাপী স্কুলের রুটিন, জরাজীর্ণ ক্লাসরুম এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার চরম তারতম্য। আন্দোলনকারীরা এমন বহু প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে ক্লাসরুমের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, অবকাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বিদ্যমান, গ্রীষ্মকালে অসহনীয় তাপমাত্রা থাকে এবং তেলাপোকার অবাধ বিচরণ দেখা যায়। এমনকি উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত 'পারকোর্সাপ' প্ল্যাটফর্মটিও বৈষম্য বাড়াচ্ছে এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে বলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

বামপন্থি ট্রেড ইউনিয়ন সিজিটির শীর্ষনেত্রী সোফি বেনে উল্লেখ করেছেন, বিগত এক দশকে অনুপস্থিত শিক্ষকের বিপরীতে স্থলাভিষিক্ত না করার হার দ্বিগুণ বেড়েছে এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অনুপাত অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, লোকদেখানো কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই অসন্তোষ থামানো সম্ভব নয়, বরং শিক্ষাবাজেটে চলমান কর্তন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

সরকারের অবস্থানের দ্বৈততা

শুরুর দিকে শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা শোনা গেলেও সময়ের সাথে সাথে সরকারের আচরণে দ্বৈত রূপ প্রকাশ পেয়েছে। তারা একদিকে আন্দোলনকারীদের দাবিকে যুক্তিযুক্ত বলছে, অন্যদিকে রাজপথের সহিংসতায় কড়া অবস্থান স্পষ্ট করছে।

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নো শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে ন্যায্য হিসেবে মেনে নিয়ে মন্ত্রিসভাকে পাঁচটি মূল ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ জারি করেছেন। এর আওতায় রয়েছে শূন্য পদে দ্রুত বিকল্প শিক্ষক পদায়ন, স্কুলের দীর্ঘ সময়সূচি পুনর্বিবেচনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তবে একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কোনো ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রশাসন। সরকারি মুখপাত্র মদ ব্রেজোঁ জোর দিয়ে বলেছেন, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। শিক্ষামন্ত্রীর দাবি, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের ভেতর বহিরাগত সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী অনুপ্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীরা এর পেছনে ইন্ধন জুগিয়ে পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে।

সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া অভিযানে প্রায় ৫ হাজার মানুষকে আটক করেছে পুলিশ, যাদের শতকরা ৮৫ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। পাশাপাশি পুলিশ, শিক্ষক ও বিক্ষোভকারী মিলিয়ে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতিমধ্যে কোটি কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে।

নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়ে উদ্বেগ

আন্দোলনের এই পর্যায়ে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের মাত্রা। লঁস শহরে কিশোরের হাত হারানোর ঘটনা সেই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।

এর আগে তুর শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের সময় গুরুতরভাবে চোখ হারায় ১৬ বছরের এক কিশোর। তার পরিবার ইতিমধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রসিকিউটর নিশ্চিত করেছেন, ওই কিশোরের চোখের ক্ষত পুলিশের ব্যবহৃত এলবিডি বা রাবার বুলেটের আঘাতের লক্ষণের সঙ্গেই সংগতিপূর্ণ এবং বিষয়টি নিয়ে আইনি তদন্ত চলছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোও নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। ফ্রান্সের মানবাধিকার সংগঠন 'লিগ অব হিউম্যান রাইটস' মন্তব্য করেছে, বিক্ষোভ দমনে পুলিশের এহেন ভূমিকা আইনের শাসনের ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বার্তাসংস্থা এএফপির তথ্যমতে, পুলিশের মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে ইতিমধ্যে পাঁচটি ভিন্ন তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

পাল্টা যুক্তিতে প্রশাসন ও পুলিশ দাবি করছে, রাজপথের সব বিক্ষোভকারী অহিংস নয়। বেশ কিছু জায়গায় নিরাপত্তা রক্ষীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি ছোড়া, ব্যারিকেডে আগুন দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। স্ট্রাসবুর্গে টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার, মার্সেইয়ে পুলিশের ওপর বিস্ফোরক নিক্ষেপ এবং রেনে শহরের রাজপথে বর্জ্যের স্তূপে অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাবলী প্রমাণ করে সংঘাত কতটা অবনতির দিকে যাচ্ছে।

সামনে আরও বড় সংঘাতের শঙ্কা

পরিস্থিতি আরও চরম রূপ নিতে পারে মঙ্গলবার। কারণ ছাত্র সংগঠনগুলো দেশব্যাপী সর্বাত্মক ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। এই কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষক সমাজ, সরকারি চাকরিজীবী, ট্রেড ইউনিয়ন এবং অভিভাবক সংগঠনগুলো। উচ্চশিক্ষার প্রায় ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ইতিমধ্যেই অবরোধের মুখে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, মঙ্গলবারের পর বিক্ষোভের আগুন আরও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ট্রেড ইউনিয়ন নেত্রী সোফি বেনে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সহিংসতা মোকাবিলার চেষ্টা করবেন তাদের কর্মীরা। তবে একই সাথে তিনি পুলিশের নজিরবিহীন দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেন।

সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের আন্দোলন কেবল শ্রেণিকক্ষের সুযোগ-সুবিধার দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা বাজেট বরাদ্দ, সামাজিক অসমতা, পুলিশের অস্ত্র ব্যবহারের নীতিমালা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে সরকারের সামগ্রিক বোঝাপড়ার এক কঠিন পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষণ হলো, প্রধানমন্ত্রী যে পাঁচটি খাতে সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন, তা বাস্তবে কত দ্রুত রূপ নেয়। কারণ লঁস শহরে এক কিশোরের হাত হারানোর রক্তক্ষয়ী ঘটনা প্রমাণ করে দিয়েছে, শিক্ষাব্যবস্থার দাবি আর রাজপথের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দ্বন্দ্ব এখন এক সুতোয় মিশে এক চরম বিস্ফোরক রূপ ধারণ করেছে।