ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ আরও ছয় মাস পর্যন্ত চলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা। তার আশঙ্কা, সংঘাতের দ্রুত অবসান না হলে এটি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন অবস্থায় পড়েছেন বলেও মনে করেন তিনি।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্যানেটা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ছয় মাসের বেশি সময় আগে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা এই যুদ্ধের শেষ কোথায়, তার কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা এখনো দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এমন এক ভয়াবহ অচলাবস্থায় আটকে আছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার কার্যকর পথ খুবই সীমিত।
বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট থাকার সময় সিআইএর পরিচালক এবং পরে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা প্যানেটা বলেন, ‘আমার মনে হয়, সমাধান হওয়ার আগেই এই যুদ্ধের আরও ছয় মাস চলার সম্ভাবনাই বেশি।’
ইরানের সংঘাতটি ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধের মতো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি ব্যর্থ যুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি। প্যানেটার মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান বা আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন।
একাধিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ড্রিসকলের মতবিরোধের খবরের মধ্যেই তার পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। এ প্রসঙ্গে প্যানেটা বলেন, মার্কিন সেনারা যখন যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন, তখন পেন্টাগন ও সামরিক কমান্ড কাঠামোয় অস্থিরতা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক। এতে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, ‘আসলে কেউই দায়িত্বে নেই।’
প্যানেটার মতে, ইরানসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা এখন দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে রক্ষায় সামরিক শক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারের সক্ষমতার ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন বার্তা প্রতিপক্ষদের কাছে পৌঁছানো বিপজ্জনক।
চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও সন্ত্রাসবাদের পাশাপাশি ইরানকেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষায়, এসব প্রতিপক্ষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, বৈঠক করছে এবং একে অন্যকে সমর্থন দিচ্ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে তারা এখন দুর্বল অবস্থানে দেখছে। এমন সময়ে দুর্বলতার কোনো বার্তা দেওয়া অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন প্যানেটা।
তবে প্যানেটার এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় পেন্টাগন। এক বিবৃতিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, পিট হেগসেথের নেতৃত্বে তারা ‘পুরোদমে কাজ করছে’। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, প্রতিরক্ষা বিভাগে বিশৃঙ্খলা চলছে—এমন ধারণার কোনো ভিত্তি নেই। বরং যেসব পরিবর্তনকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেগুলো সামরিক বাহিনীর সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে দ্য গার্ডিয়ান হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের সামনে তিন পথ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর প্রায় তিন সপ্তাহ পরও প্যানেটা ট্রাম্পের অবস্থানকে ‘উভয়সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব শেষ করতে যুদ্ধ আরও বাড়ানো হবে, নাকি সরে গিয়ে বিজয় ঘোষণা করা হবে—ট্রাম্পকে মূলত এই দুই বিকল্পের মধ্যে বেছে নিতে হচ্ছে। তবে যুদ্ধ থেকে সরে এলে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন—এমন ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্যানেটা বলেন, পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার ভাষায়, ট্রাম্প নিজেই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ কঠিন করে ফেলেছেন।
প্যানেটার বিশ্লেষণে ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। প্রথমটি হলো যুদ্ধ থেকে সরে এসে এটিকে ব্যর্থতা হিসেবে স্বীকার করা। তবে ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নেবেন—এটি বিশ্বাস করা কঠিন বলে মনে করেন তিনি।
দ্বিতীয় পথ হলো বর্তমান অচলাবস্থা অব্যাহত রাখা। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, একই সঙ্গে আরও বড় যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে। কিন্তু কেউ আলোচনায় বসবে না কিংবা আত্মসমর্পণও করবে না। প্যানেটার আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।
তৃতীয় বিকল্প হিসেবে তিনি হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলেছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার—বিশ্ববাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল বন্ধ বা ব্যাহত করার সক্ষমতা—কেড়ে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
প্যানেটা বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ট্রাম্পকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে বর্তমান অচলাবস্থাই চলতে থাকবে এবং প্রেসিডেন্ট এমন ভান করতে পারেন যে তিনি কোনোভাবে জয়ী হচ্ছেন। অথচ বাস্তবে তিনি জয়ী হচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্যানেটা বলেন, এ জন্য মার্কিন কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। তার মতে, ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট করতে হবে যে এই মুহূর্তে তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন
প্যানেটার মতে, ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি শিগগিরই হতে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রয়েছে—এমন দাবি করে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এখন প্রশ্ন হলো, তিনি সত্যিই পরিস্থিতি বদলাতে প্রয়োজনীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন কি না।
সিআইএর সাবেক পরিচালক বলেন, নানা কারণে ট্রাম্প এখন সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন। শুধু তার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তিনি যেসব হুমকি দিচ্ছেন, সেগুলোও পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
এর মধ্যেই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতে রাজি হননি। আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সংঘাতটি শেষ হবে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর উত্তর তার জানা নেই এবং বিষয়টি ইরানিদের জিজ্ঞাসা করতে হবে।
প্যানেটা বলেন, অনেক মার্কিন নাগরিকও ট্রাম্পের এই যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপের উল্লেখ করে তিনি বলেন, অধিকাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল এবং তারা এই সংঘাতের বিরোধী।
দীর্ঘ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনা
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন থেকেও ট্রাম্প প্রশাসন ও পেন্টাগনের শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন প্যানেটা। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে রণতরিটি ২৬০ দিনের বেশি সময় কোনো বন্দরে না থেমে মোতায়েন ছিল। রেকর্ড সময়ের এই মোতায়েন শেষে চলতি সপ্তাহে এটি থাইল্যান্ডে পৌঁছেছে।
দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার কারণে রণতরিতে সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
প্যানেটার ভাষায়, কোনো ধরনের পালাবদলের পরিকল্পনা ছাড়া সেনাসদস্যদের অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যায় না। তার মতে, সমস্যা শুধু যুদ্ধের গতিপথে নয়; জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন সেনাদের সামরিক বাহিনী যথাযথভাবে সহায়তা করছে কি না, তা নিয়েও এখন আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।