মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের একটি সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রকাশের পর এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়, যেখানে তাকে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদক নির্মূল অভিযানে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়।
প্রকাশিত ওই দৃশ্যপটে দেখা যায়, নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৬ আসনের অন্তর্গত গেন্ডারিয়া থানার ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের একটি রেললাইন সংলগ্ন বস্তিতে আকস্মিকভাবে হাজির হন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় তিনি গাড়ি থেকে নেমেই হাতে থাকা অস্ত্র উঁচিয়ে কাউকে ধরার নির্দেশ দিয়ে চিৎকার করতে থাকেন। একই সময়ে তার সঙ্গীদের মধ্য থেকে কাউকে গুলি করার হুমকি দিতেও শোনা যায়। সেই মুহূর্তে প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীরা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে ধাওয়া করেন এবং একজনকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন।
এই অভিযানের বিষয়ে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির জানান, ওই এলাকা থেকে ছয় ব্যক্তিকে আটকে রেখে প্রতিমন্ত্রী থানায় খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তাদেরকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। আটককৃতদের কাছ থেকে সাদা রঙের পাউডার সদৃশ কিছু বস্তু উদ্ধার করা হয়েছে, যা আদতে হেরোইন কি না, তা রাসায়নিক পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। এদিকে, প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা বস্তুটির বৈধতার প্রশ্নে তার একান্ত সহকারী সচিব (এপিএস) আরিফুল ইসলাম দাবি করেছেন, সেটি কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না, বরং তিনি একটি লাঠি হাতে অভিযানে গিয়েছিলেন।
সরকারের একজন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ব্যক্তির এভাবে সরাসরি মাঠে নেমে অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে আইনি ও সুশীল সমাজে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাহী বিভাগের সদস্য হিসেবে সরাসরি এমন অভিযান পরিচালনা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো ক্ষমতা সংবিধান মন্ত্রীদের দেয়নি। উচ্চ আদালতের আইনজীবী তাওহীদুল ইসলামের মতে, আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা-২০২৫ এর ২৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, লাইসেন্সকৃত অস্ত্র কেবলমাত্র নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে বহন করা বৈধ, অন্যের মনে ভীতি সঞ্চার বা জনসমক্ষে প্রদর্শন করার জন্য নয়। এছাড়া ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের ২১ ধারা মোতাবেক এমন শর্ত ভঙ্গের জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা অভিমত দিয়েছেন যে, আইন মোতাবেক কেবল আত্মরক্ষার জন্যই অস্ত্রের ব্যবহার যৌক্তিক। একজন প্রতিমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে পুলিশের প্রটোকল থাকে, তাই তার নিজের অস্ত্র প্রদর্শনের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকাই বাঞ্ছনীয়।
পুরো বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তার তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তবে নিজের শেয়ার করা ওই ভিডিওবার্তায় তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, তার নির্বাচনী এলাকাকে সম্পূর্ণভাবে মাদকমুক্ত না করা পর্যন্ত এই ধরনের তৎপরতা চলমান থাকবে। মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তি যে রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন তিনি। নিজ দলের কেউ এমন অপকর্মে যুক্ত থাকলে তার জন্য আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। পরিশেষে দেশব্যাপী এই মাদকবিরোধী অভিযান ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি স্থানীয় জনসাধারণকে এই সামাজিক ব্যাধি দূরীকরণে সর্বাত্মক সহায়তা করার আহ্বান জানান।