ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য অধিকার পেল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানি। এসব তেলক্ষেত্রে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, যা দেশটির প্রমাণিত মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।
বিপুল অঙ্কের এই চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা উভয় পক্ষই নিজেদের জন্য লাভজনক হিসেবে তুলে ধরলেও এর শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে চুক্তিটিকে ঘিরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল ও সমাজতন্ত্রীদের একাংশের মধ্যে।
গত জানুয়ারিতে কারাকাসে নিকোলাস মাদুরোর বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী অভিযান চালিয়ে তাকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তার প্রশাসনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তখন ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ এবং ভবিষ্যতের জন্য দেশটির তেল বিক্রির বিষয়টিও পরিচালনা করবে। সেই পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন হলো কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বিশাল তেল চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে।
বিবিসির খবরে বলা হয়, চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি কোম্পানি ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে ১০০ বছরের জন্য তেল উত্তোলনের অধিকার পাবে। এসব তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে। অর্থাৎ দেশটির প্রমাণিত তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি এই চুক্তির আওতায় পড়ছে।
চুক্তিটিকে দুই পক্ষই নিজ নিজ দেশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একে ‘বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, এর মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি ডলার (৭ হাজার ৪০০ কোটি পাউন্ড) বিনিয়োগ এবং ২০ হাজার কোটি ডলারের বেশি কর রাজস্ব আসবে।
তবে এই চুক্তির সমালোচনাও হয়েছে ব্যাপকভাবে। ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস বলেন, ‘এটি একটি ভয়াবহ চুক্তি। রদ্রিগেজ কোনো বিনিময় ছাড়াই জাতীয় সম্পদের ২০ শতাংশ দিয়ে দিয়েছেন। আমার মনে হয়, ওয়াশিংটন থেকে যে দাবি তার কাছে আসছে, তিনি কেবল সেটিই মেনে চলছেন।’
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজ চুক্তিটির কাঠামোর কিছু বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনেজুয়েলার একটি বেসরকারি কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের (নাবেপ) সঙ্গে কাজ করবে। শেভরনের পর ভেনেজুয়েলায় বেসরকারি খাতে তেল উৎপাদনে নাবেপ দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান।
নাবেপের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কাজের ধরন নিয়েও চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা’ থাকবে। পাশাপাশি নাবেপের পরিচালনা পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।
বিবিসি লিখেছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি পাম্পে তেলের দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তেল উৎপাদন বাড়লে তা ভোক্তাদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম ফক্স বিজনেসকে বলেন, এই চুক্তি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘সংকটপূর্ণ পথগুলো’ থেকে সরিয়ে পশ্চিম গোলার্ধে ফিরিয়ে আনছে।
এলিয়ট অ্যাব্রামসও মনে করেন, বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ যখন এতটা অনিশ্চিত, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার অংশীদারত্বের একটি যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে তার মতে, চুক্তির শর্ত এতটাই একতরফা যে এটি ‘উপনিবেশবাদ দেখতে কেমন হতে পারে, তার এক ধরনের কল্পনাজগতের উদাহরণ’।
হোয়াইট হাউজ বলেছে, এই চুক্তির মাধ্যমে ‘মনরো নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে’। ১৯ শতকের এই নীতির মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের ধারণা তুলে ধরা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউজের ভাষ্য, এর লক্ষ্য হলো ‘আমাদের বাড়ির আঙিনা থেকে বিদেশি ক্ষতিকর প্রভাব দূর করা এবং পশ্চিম গোলার্ধে আমেরিকার আধিপত্য যাতে আর কখনো প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা’।
দুই দেশের সরকারই বলছে, পরিকল্পনাটি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য উপকারী হবে। তবে চুক্তির বাস্তবায়ন, সময়সীমা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে।
চুক্তির নির্ধারিত সময়সীমাই এর অন্যতম বড় সমস্যা। ট্রাম্প বলেছেন, দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই এই চুক্তি থেকে মুনাফা আসবে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার তেল খাতের বর্তমান দুরবস্থা বিবেচনায় নিলে উৎপাদন বাড়িয়ে লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে এক দশক সময় লাগাটাই বেশি বাস্তবসম্মত।
হিউস্টনের রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের লুইস পাচেকো বিবিসি মুন্ডোকে বলেন, ৩০ বছর আগের তেল উৎপাদনের পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলার আগামী আট বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘এই সম্পদ কে পরিচালনা করবে এবং কী উদ্দেশ্যে করবে, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।’
পাচেকো প্রশ্ন তোলেন, ‘যারা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় তেল বুমের সম্পদ ইতিমধ্যে অপচয় করেছে, তাদেরই কি আবার সেই অর্থ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে?’
ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদের অতীত অব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গেই তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলও উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে দেলসি রদ্রিগেজের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। বিরোধীদের অভিযোগ, রদ্রিগেজ মাদুরোর নেতৃত্বাধীন একই শাসনব্যবস্থার অংশ।
ট্রাম্প প্রশাসন একসময় মাদুরো সরকারকে দুর্নীতিগ্রস্ত মাদকচক্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় নৌবহরও মোতায়েন করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
সেই অবস্থান থেকে মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ওয়াশিংটনের এত দ্রুত ও সহজে কাজ শুরু করাকে বিরোধীরা ক্ষোভের সঙ্গে দেখছে।
বিবিসি লিখেছে, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারিয়া কোরিনা মাচাদো হয়তো প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনা করবেন না। কারণ ক্ষমতায় যেতে চাইলে তার ট্রাম্পের সমর্থন প্রয়োজন। তবে অন্যরা এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলেছেন।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো হাউসমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি ভেনেজুয়েলানদের মুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার না করে আমাদের নিপীড়কদের সঙ্গে জোট বাঁধার পথ বেছে নিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে আপনি সম্পদ দখল এবং একটি অবৈধ ও নিপীড়নমূলক সরকারের সঙ্গে অসাংবিধানিক চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।’
ভেনেজুয়েলায় শিগগির কোনো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এমনকি নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনাও নেই। বিরোধীদের অনেকেই তাই এই চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন।
তবে রাজনৈতিক আদর্শের অন্য প্রান্তেও একই ধরনের ক্ষোভ রয়েছে। ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল পিএসভিইউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিতে রদ্রিগেজকে সমর্থন করলেও ভেনেজুয়েলার অনেক সমাজতন্ত্রী এটিকে আত্মসমর্পণ হিসেবে দেখছেন।
প্রায় তিন দশক ধরে এই অঞ্চলে ওয়াশিংটনের প্রভাবের বিরোধিতা করার পর এখন তারা মনে করছেন, রদ্রিগেজ দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ পুরোনো শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএর সাবেক প্রধান এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সময়ের তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেজ বলেন, এই চুক্তি ‘তেল তুলে দিচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উপনিবেশবাদের দরজা খুলে দিচ্ছে’।
২০০৮ সালের শুরুর দিকে চাভেজ তার জনপ্রিয় রোববারের টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘আলো প্রেসিদেন্তে’ প্রচার করেছিলেন অরিনোকো নদীর অববাহিকায় সাবেক এক্সনমোবিলের তেলক্ষেত্র থেকে।
তখন ওই অঞ্চলে তেল কোম্পানিটির কিছু সম্পদ জাতীয়করণ করে চাভেজ ছিলেন বেশ দৃঢ় অবস্থানে।
রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির তেলক্ষেত্রগুলোর মালিকানা নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘লাগাম এখন আমাদের হাতে এবং আমরা আর কখনো তা ছেড়ে দেব না।’ একই সঙ্গে ওয়াশিংটনপন্থী আগের সরকারগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, তারা ভেনেজুয়েলাকে ‘গ্রিংগোদের দেশে’ পরিণত করেছিল।
পিডিভিএসএর কর্মীদের করতালির মধ্যে চাভেজ বলেছিলেন, ‘এটি আমাদের দেশের সম্পদ চুরি ছিল। কিন্তু বলিভেরিয়ান বিপ্লব এতে বাধা দিয়েছে।’
অথচ এখন তারই অনুসারীদের একজন— তার মনোনীত উত্তরসূরির উত্তরসূরি ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই অস্পষ্ট চুক্তিতে সই করেছেন এবং সেটিকে ভেনেজুয়েলার বিজয় হিসেবে তুলে ধরছেন।