বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ২৫,৪৯১ কোটি টাকা ঘাটতি

নিয়ম অনুযায়ী এনবিআর তাদের দাপ্তরিক পোর্টালে রাজস্ব আদায়ের মাসিক খতিয়ান হালনাগাদ করে থাকে। তবে চলতি অর্থবছরে এখনো পর্যন্ত সার্বিক রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক বিবরণী উন্মুক্ত করেনি সংস্থাটি।

এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ২৫,৪৯১ কোটি টাকা ঘাটতি
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উদ্বোধনী দুই মাসেই রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণে গভীর ঘাটতির মুখে পড়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। জুলাই ও আগস্ট প্রান্তিকে সংস্থাটির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা থাকলেও বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্বের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকায়, যা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে মাত্র ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক’ পর্যালোচনায় এ চিত্র ফুটে উঠেছে। সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে এ দলিলটি সার্বজনীন করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী এনবিআর তাদের দাপ্তরিক পোর্টালে রাজস্ব আদায়ের মাসিক খতিয়ান হালনাগাদ করে থাকে। তবে চলতি অর্থবছরে এখনো পর্যন্ত সার্বিক রাজস্ব আদায়ের আনুষ্ঠানিক বিবরণী উন্মুক্ত করেনি সংস্থাটি। ফলে তাদের প্রাথমিক হিসাব বিশ্লেষণ করেই জিইডি এই সারসংক্ষেপ তৈরি করেছে।

জিইডির তথ্যানুসারে, শুধু আগস্ট মাসেই রাজস্ব আদায়ের প্রাক্কলন ছিল ৪২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। যার বিপরীতে সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে ২৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। একক মাস হিসেবে এতে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭১ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও পূর্ববর্তী বছরের একই মাসের তুলনায় এ বছর রাজস্ব প্রাপ্তিতে ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে আমদানি ও রপ্তানি শুল্ক খাতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দুই হাজার ৪১৯ কোটি টাকা কম জমা পড়েছে। একইভাবে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট খাতে ঘাটতি ছিল ছয় হাজার ৭৬২ কোটি টাকা এবং প্রত্যক্ষ আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে ঘাটতির অঙ্ক তিন হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা। পর্যালোচনায় জোর দিয়ে বলা হয়, টানা দুই মাস ধরে এমন নিম্নগতি বজায় থাকায় রাজস্বের গতি বাড়াতে করসংক্রান্ত আইন ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

উল্লেখ্য, বর্তমান অর্থবছরে কর আদায়কারী সংস্থাটিকে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকার এক বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যা সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের প্রকৃত প্রাপ্তির চেয়ে প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। বাজেট প্রণয়নের সময় তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমার সুযোগ সৃষ্টি করায় রাজস্ব উত্তোলনে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়, যার নেতিবাচক ছাপ পড়েছে সামগ্রিক হিসাবে। এই জটিলতা কাটাতে প্রশাসন পুনরায় মাসিকভিত্তিতে ভ্যাট বিবরণী জমার বিধানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সামষ্টিক অর্থনীতি আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল প্রতীয়মান হলেও বিভিন্ন সূচকে বৈষম্যমূলক চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ প্রশমিত হওয়ার গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের ওপর ভর করে বাইরের খাত সুরক্ষিত থাকলেও রপ্তানি বাণিজ্যে কিছুটা মন্দাভাব বিরাজ করছে।

স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় থাকার পূর্বাভাস দিলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা সাধারণের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পারিশ্রমিক বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ব্যাংকিং চ্যানেলে গচ্ছিত আমানতের সাথে ব্যক্তিখাতের ঋণ বিতরণের দুর্বল সমন্বয় কাটিয়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়।

ব্যাংকিং খাতে আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধির তুলনামূলক ব্যবধান স্পষ্ট করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকে সঞ্চয়ের হার যেভাবে বাড়ছে, বেসরকারি খাতে ঋণ ছাড়ের গতি তার ধারেকাছেও নেই। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য উদ্বৃত্ত থাকলেও উৎপাদনশীল খাতে সেই তহবিলের সদ্ব্যবহার ঘটছে না। গেল আগস্টে আমানতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশে পৌঁছালেও বেসরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধি থমকে ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

এ প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিখাতে ঋণ গ্রহণের আনুষঙ্গিক ব্যয় হ্রাস, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ঋণদানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সবিশেষ জোর দেওয়া হয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরে এলে সঞ্চয়ের গতি বৃদ্ধি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে বড় জোগানদার হতে পারে বলে মত দেওয়া হয়।

এছাড়া নিজস্ব রাজস্ব সংগ্রহ এবং বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাস্তবসম্মত মুদ্রা বিনিময় হার ধরে রাখাও জরুরি। আগামী দিনগুলোতে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা নির্ভর করবে সার্বিক ভারসাম্য বজায় রাখা, ঋণের পরিবেশ সহজ করা এবং রপ্তানি তালিকায় নতুন পণ্যের বৈচিত্র্য আনয়নের ওপর।