সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাস, ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

সূরা নিসায় উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আয়াতে হেবা, ওসিয়ত ও উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিধান রয়েছে, তার সঙ্গে এই আইনের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে— আমরা কি কুরআনের মূলনীতিকে রাখব, নাকি বাদ দেবো? আমাদের কি বাদ দেওয়ার কোনো অধিকার আছে?

সম্পত্তি হস্তান্তর বিল পাস, ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের ওয়াকআউট

সম্পত্তি দান করার পরও দাতার আজীবন ভোগ-দখলের অধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ দিতে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস করেছে জাতীয় সংসদ। বিলের বিভিন্ন ধারাকে ‘কোরআন ও সুন্নাহর বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। বিলের ভোটে অংশ না নিয়ে এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেন তারা।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করলে তা পাস হয়। বিলটি চলতি অধিবেশনে পাস না করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি জানান বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা। তবে আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন এই পদ্ধতি মুসলিম আইনের হেবা নয়। হেবা বা অন্য কোনো আইনে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিও এতে বাধাগ্রস্ত হবে না।

বিলটি বিবেচনার প্রস্তাব উত্থাপনের পর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে কণ্ঠভোটে দুটি প্রস্তাবই নাকচ হয়ে যায়। বিলের বিভিন্ন দফায় আনা সংশোধনীও নাকচ হওয়ার পর আইনমন্ত্রী সেটি পাসের প্রস্তাব দেন।

স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমেদ বিলটি পাসের জন্য ভোট দিলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে কণ্ঠভোটে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়।

নতুন যে পদ্ধতি যুক্ত হলো

বিলে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নতুন পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মা-বাবা তাদের সন্তানকে, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে এবং নাতি-নাতনিরাও বিপরীতক্রমে সম্পত্তি দান করতে পারবেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও এই পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যাবে।

এই ব্যবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখতে পারবেন।

‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ বলছেন বিরোধীরা

পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বিলটিকে সরাসরি ‘কুরআন-সুন্নাহবিরোধী’ বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি দানের সুযোগ দেওয়া হলে ইসলামের উত্তরাধিকার ও হেবার বিধান পাশ কাটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ময়মনসিংহ-৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য কামরুল হাসান বলেন, ১৮৮২ সালের আইন সংশোধনের আড়ালে মুসলিম পারিবারিক আইনে হাত দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, মানবাধিকার, সমান অধিকার কিংবা পিতা-মাতার অধিকারের কথা বলে আসলে এই আইন পাস করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল আলীম বলেন, মা-বাবাকে রক্ষা করতে হলে কোরআনের বিধান অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশের বেশি কেউ দান করতে পারবেন না। তার মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এই আইনই উত্থাপন করা উচিত ছিল।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ বলেন, গুটিকয়েক অপরাধীর জন্য দেশের মানুষের মৌলিক চিন্তা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস হোক—এটি একজন সুনাগরিক বা একটি ধর্মের মানুষ হিসেবে তারা প্রত্যাশা করেন না।

পাবনা-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য আলী আসগর ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিলটি বিবেচনার দাবি জানান। পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম বিলটি ফতোয়া বোর্ডে পাঠানোর প্রস্তাব করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এ আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার কোনো প্রশ্ন নেই। তবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্য যে চিরস্থায়ী বিধান দিয়েছেন, সেটিতে যারা বিশ্বাস করেন তারা এই আইনটির প্রয়োগ কীভাবে দেখবেন বা নেবেন—সেই প্রশ্ন রয়েছে।

সূরা নিসায় উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আয়াতে হেবা, ওসিয়ত ও উত্তরাধিকার নিয়ে যে বিধান রয়েছে, তার সঙ্গে এই আইনের স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি কুরআনের মূলনীতিকে রাখব, নাকি বাদ দেবো? আমাদের কি বাদ দেওয়ার কোনো অধিকার আছে?

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাও বিলটি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি প্রস্তাব করেন, দাতার জীবদ্দশায় তার লিখিত সম্মতি ছাড়া গ্রহীতা যেন ওই সম্পত্তি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিতে বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে না পারেন।

আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের আপত্তির জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এই আইনের মাধ্যমে মুসলিম আইনে কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি। বিলের ১২২এ (৪) উপধারা পড়ে শুনিয়ে তিনি বলেন, নতুন পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর করা হলেও হেবা বা অন্য কোনো আইনে স্বীকৃত সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা ক্ষুণ্ন হবে না।

আইনমন্ত্রী বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে বিক্রি, বন্ধক, ইজারা, বিনিময় ও দানের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। নতুন বিধানটি সাধারণ দানের একটি আলাদা পদ্ধতি; এটি হেবা নয়। হেবা কোরআনিক আইন অনুযায়ীই হবে।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন বিধানে মা-বাবা সন্তানকে সম্পত্তি দান করলে মালিকানা সন্তানের কাছে চলে যাবে, শুধু জীবনকালীন ভোগাধিকার মা-বাবার কাছে থাকবে।

এই ব্যবস্থার পক্ষে মুসলিম আইনের বিভিন্ন বই ও আদালতের রায়ের উদাহরণও দেন আইনমন্ত্রী। তিনি ১৯২২ সালের প্রিভি কাউন্সিলের একটি রায়সহ ভারত ও পাকিস্তানের আদালতের কয়েকটি সিদ্ধান্ত এবং ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের উদাহরণ তুলে ধরেন।

প্রস্তাবিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে হেবা ও ওসিয়তের বিধানে কোনো পরিবর্তন আনা হচ্ছে না উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রথম বলছি, এই গিফটটা কখনোই হেবা না। হেবার সঙ্গে সম্পর্কিত না। একজন মুসলমান চাইলে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী নিঃশর্ত হেবা করতে পারবেন।

সংশোধনী প্রস্তাবও নাকচ

বিলের ৩ ধারায় ১৯৩৭ সালের মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্টের সুরক্ষা আরও স্পষ্টভাবে যুক্ত করার জন্য সংশোধনী আনেন নাজিবুর রহমান।

তবে আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন বিলেই হেবা এবং ১৯৩৭ সালের আইনের অধীন সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতিকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। ফলে আলাদা করে সংশোধনী আনার প্রয়োজন নেই।

পরে কণ্ঠভোটে নাজিবুর রহমানের সংশোধনী প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। এরপর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করার পর কণ্ঠভোটে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়।