স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি তা সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে তা সতেজভাবে রপ্তানির দুয়ার উন্মোচিত করতে দেশের প্রতিটা জেলায় ধাপে ধাপে আধুনিক মিট প্রসেসিং সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
একইসাথে গবাদিপশু ও মৎস্য খাতকে আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী করে তুলতে একাধিক সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সুপ্রিম সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব দপ্তরে বাসসের সাথে এক একাত্ত আলোচনায় এমন তথ্য প্রকাশ করেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
একান্ত এই সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের দুর্নীতি ও দীর্ঘদিনের সঠিক তদারকির অভাবে এই খাতটি মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছিল। বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সেক্টরটিকে নতুন করে সাজাতে নিষ্ঠার সাথে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। গত আধবছরে মন্ত্রণালয়ের কর্মী ও কর্মকর্তারা অবিরাম পরিশ্রম করে ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল ও আধুনিক রূপরেখা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রী আরও পরিষ্কার করেন যে, যেকোনো দুর্নীতির তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যে তদন্তকারী একাধিক গ্রুপ মাঠে রয়েছে। অনুসন্ধানের প্রতিবেদন হাতে আসার সাথে সাথেই দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ওপর জোর প্রদান করা হয়েছে।
তিনি মন্তব্য করেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে খাদ্য উৎপাদন শৃঙ্খলের একেবারে সূচনা বিন্দু থেকেই গুণগতমান নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। তাই মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা থেকে শুরু করে নিরাপদ দানাদার খাদ্য সরবরাহ ও আধুনিক উৎপাদন কৌশলের প্রয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে জীবাণুমুক্ত মাংস ও প্রাণিজ খাদ্য পৌঁছাতে খামারি ও উদ্যোক্তাদের সাথে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন মতবিনিময় সভা আয়োজন করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে খবর, অবহেলার কারণে প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী গোয়াল ফার্মটিকে আবার সচল করার উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি সাধারণের সুবিধার্থে গত রামাদান মাসে ঢাকার ৩৬টি পয়েন্টসহ সারা দেশে ট্রাকে করে সুলভ মূল্যে প্রোটিনজাতীয় পণ্য বিক্রি করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।
কোরবানির পশুর বাজার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, অবৈধ উপায়ে সীমানা অতিক্রম করে বিদেশি গবাদিপশু ঢোকা শক্তভাবে দমন করা হয়েছিল। এর দরুন দেশের খামারিরা ন্যায্য মূল্য পেয়েছেন এবং সাধারণ মানুষও সাশ্রয়ী মূল্যে পশু কিনতে পেরেছেন। এ বছর অভ্যন্তরীণভাবেই প্রায় ৯৮ লাখ পশু কোরবানি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণার সফলতার কথা তুলে ধরে সালাউদ্দিন টুকু বলেন, বিএলআরআই সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে দুটি নতুন ভ্যাকসিন প্রস্তুত করেছে যা আগে বাইরে থেকে চড়া দামে কিনে আনতে হতো। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বিরাট সাশ্রয় ঘটবে।
চিড়িয়াখানা প্রসঙ্গে তিনি জানান, রূপকল্প অনুযায়ী জাতীয় চিড়িয়াখানাকে বিশ্বমানের করে তোলার কাজ এগিয়ে চলছে। সেখানে নতুন ৪টি প্রাণী ও সম্প্রতি জন্ম নেওয়া তিনটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ছানার আত্মপ্রকাশ দর্শনার্থীদের আগ্রহ বহু গুণে বাড়িয়েছে। ঢাকার বাইরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশালে নতুন চিড়িয়াখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই ইতিমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে।
মিট প্রসেসিং সেন্টারের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত যুক্ত করে জানান, ইতিমধ্যে ১৩টি প্রসেসিং হাব চালু হয়েছে যার একটি তিনি নিজে বগুড়ায় উদ্বোধন করেছেন। অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রোটিনসমৃদ্ধ বিশেষ এক ধরণের ঘাসের প্রযুক্তি ও বীজ দেশে আনা হয়েছে এবং শত শত খামারিকে এর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ফলে পশুর খাবার উৎপাদন খরচ কমবে এবং বাজারে গরুর মাংসের দর সাধারণের নাগালে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
একই সাথে ইলিশের বংশবৃদ্ধি বাড়াতে জাটকা ধরা বন্ধের দিনগুলোতে জেলেদের আর্থিক ক্ষতি পোষাতে প্রায় ২৪ কোটি টাকা নগদ ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। সমগ্র ব্যবস্থার লক্ষ্যই হলো খামারিদের আয় বাড়ানো, নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্যের নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করানো।