সোমবার, 19 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সংসার চালাতে ঋণ করেছে দেশের ৪৭ শতাংশ পরিবার

গত এক বছরে সাধারণ খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ধারদেনা করতে বাধ্য হয়েছে।

সংসার চালাতে ঋণ করেছে দেশের ৪৭ শতাংশ পরিবার
নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশচুম্বী দাম, প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি এবং নতুন কর্মসংস্থানের অভাব— সব মিলিয়ে দৈনন্দিন খরচ সামাল দিতে গিয়ে দেশের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী এখন বাধ্য হয়ে ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এমন এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

জাতীয় বেতন কমিশনের নির্দেশনায় বিবিএসের দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেলের করা ওই জরিপে দেখা যায়, গত এক বছরে সাধারণ খরচ মেটাতে গিয়ে দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ধারদেনা করতে বাধ্য হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে শহরের বাসিন্দাদের তুলনায় গ্রামীণ জনপদের মানুষদের আর্থিক দুর্দশা তুলনামূলক বেশি।

আগের বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এই গবেষণায় গ্রাম, শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকার মোট তিন হাজার পরিবারের সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, টিকে থাকার তাগিদে গ্রামাঞ্চলে সর্বোচ্চ ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার দেনার দায়ে আবদ্ধ হয়েছে। অন্যদিকে, সাধারণ শহরাঞ্চলে এই হার ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে তা ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানটি স্পষ্টভাবেই নির্দেশ করে যে, নগরের মানুষের তুলনায় প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবারগুলো বর্তমানে তীব্রতর আর্থিক সংকটের ভেতর দিয়ে দিন পার করছে।

পরিবারগুলোর গড় আর্থিক অবস্থার চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, অথচ তাদের গড় ব্যয় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকায়। ফলস্বরূপ মাস শেষে প্রতিটি পরিবার গড়ে এক হাজার ৭৯৮ টাকার আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ছে। এই শূন্যস্থান পূরণে বাধ্য হয়েই তারা পূর্বের জমানো সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন অথবা নতুন করে ঋণ নিচ্ছেন। অঞ্চলভেদে খরচের ধরনেও ব্যাপক ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকাগুলোতে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় গড়ে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা, সাধারণ শহরে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ পরিমণ্ডলে তা ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পুরো দেশে মোট খরচের প্রায় অর্ধেক খাবার কেনায় এবং বাকি অর্ধেক অন্যান্য খাতে চলে যায়। তবে গ্রামের মানুষদের খরচের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনেই ব্যয় হয়। এর বিপরীতে সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের মোট খরচের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন প্রয়োজনে।

আর্থিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বর্তমান এই নাজুক পরিস্থিতির পেছনে মহামারি পরবর্তী দুর্বল অর্থনীতি, শ্লথ প্রবৃদ্ধি, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের স্থবিরতাকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কারণে নয়, বরং জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মানুষের খরচ বেড়েছে। গ্রামের দিকে উপার্জনের বিকল্প মাধ্যম না থাকায় সেখানে ঋণের হারও বেশি। এছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের সুফলও কেবল সীমিত কিছু মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। সরকারি তথ্যমতে, গত ৫৬ মাস ধরে দেশে মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি, যা সাধারণের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। বিবিএস-এর সূচক অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ থাকলেও সেপ্টেম্বরে তা আরও কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

দেশের এই সার্বিক অর্থনৈতিক চাপের প্রতিচ্ছবি বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নেও ফুটে উঠেছে। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমবাজারে চাহিদার ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনমান দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, যা ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সাল নাগাদ আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে।