বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায়ে মি. জাস্টিস তাফাজ্জল ইসলাম এটর্নি-জেনারেল মাহবুবে আলমের কথা প্রতিধ্বনি করে লিখেছেন:
Learned Attorney General drew our attention to the intensity of the brutality from the evidence and submitted that when weeping Russel wanted to go back to the lap of his mother, wounded Sheikh Naser taking shelter in a bathroom, was crying for water, Begum Fazilatunnessa Mujib seeing her husband Bangabandhu lying dead in a pool of blood in the stair cried out and asked to kill her, 'নরপিশাচরা' (devils) silenced all of them with shower of bullets exceeding the cruelty perpetrated by demon force of devil Yeazid in “Karbala”.
... the then Government not only harboured those criminals but also allowed Ltd. Col. (Retd.) Syed Faruque Rahman to float a political party in the country named "Freedom Party" and a National Daily named "The Millat" and also allowed to contest as a Presidential candidate in the general election, Major (Retd.) Bazlul Huda and Ltd. Col. (Retd.) Kh. Abdur Rashid was allowed to contest in the general election in 1996 and was elected as Member of the Parliament and Kh. Rashid was made leader of the opposition earning hatred and discord of the people."
কী বিচিত্র এই দেশ! অ. "জয় বাঙলার দরবেশ"
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা।
রাঙা চাচা সেবার জাতীয় নির্বাচনে নিজের ঝাঁড়ের বাঁশ কেঁটে, নিজের গ্যাঁইটের পয়সায় রঙিন কাগজ কিনে বিশাল নৌকা বানিয়ে এক নির্বাচনী সমাবেশে হাজির হন। প্রার্থী বা প্রার্থীর অনুসারীরা তাঁর মেধাকে মূল্যায়ন করেননি বা খেয়াল করেননি। চায়ের দোকানে এ নিয়ে লোকজন রাঙা চাচাকে পরিহাস করে।
চা হয়তো চাচার একটু বেশিই তেতো লেগেছিলো সেদিন।
পরের দিন সকালে রাঙা চাচার সাথে আমার কথা হয়েছিলো। আমি তখন হাই স্কুলে পড়ি। হাতে ফুরন্ত বিড়ি টেনে টেনে চাচা আমাকে বলতে থাকেন:
"বাজান, কাল রাত্তিরি স্বপ্নে দেহি আলখেল্লা পরা এক লোক আমাগের উঠোনে আইসে দাঁড়ায়ে আছে। ভালোভাবে খিয়াল করে দেহি তিনি শ্যাখ সাহেব! ... তো "শ্যাখ সাহেব আমার কাছে বাত্তা নিলেন, 'তুমরা আমারে মা[ই]রে সুহি আছো তো'?"
খানিক ধ্যান ধরে রাঙা চাচা আবার বলা শুরু করলেন:
"বুজিছো বাজান, উনারে দরবেশের মতোন দ্যাহা যাচ্ছিলো ... শ্যাখ সাহেব বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেলেন ...যাওয়ার সুমা আমি উনারে জোরে ডাক দিলাম। এরপর তো আমার ঘোম ভাইয়ঙে গিলো।"
আমি রাঙা কাকার মুখের দিকে তপ্পন মেরে চেয়ে থাকি। তাঁর মুখের বেদনা ধরার চেষ্টা করি। মানেও পাই ছাড়া ছাড়া।
আলী কেনান চরিত্রের (রূপক) কথা টানা যায়। আহমদ ছফা তাঁর "একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন" উপন্যাসে "জয় বাঙলার দরবেশ" দাবিকারী আলী কেনান ফকিরকে শেখ মুজিবের সমান্তরালে টানেন।
সম্ভবত পরিহাস করেই আহমদ ছফা আলী কেনানের মুখ দিয়ে বলান:
“শেখ মুজিব বাঁইচ্যা নাই, আমি ঢাকায় থাকুম কেরে? হের সমাজতন্ত্র অইল না, আমি হইলদ্যা পাখিরে হারাইলাম।”
আলী কেনানে খাঁদ থাকলেও, রাঙা চাচার নিরূপণে অবশ্য কোনো খাঁদ নেই।
তাঁর ভাবনা থেকে আমি উপলব্ধি করি যে, চর্যাপদের দেশের 'শ্যাখ মুজিব' বাঙলার আলপথ দিয়ে দ্বারে দ্বারে দরবেশ বেশে ঘুরে বেড়ান।
দেখতে চান তাঁর প্রিয় বাঙলার দুঃখী মানুষ ক্যামন আছে!
এই যে তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্যাড়ান তাই বোধ করি ফকির রাঙা চাচার ভাবনায় শ্যাখ সাহেব "দার-ভিশ" !
রাঙা চাচা পানি পড়া জানতেন। আমরা তাঁকে তাই "ফকির" হিসেবেও জানতাম। আমার ধারণা নিজেকে তিনি মুজিবরূপে দেখতে পেতেন:
"বিপ্লব-স্পন্দিত বুকে মনে হয়, আমিই মুজিব!"
রাঙা চাচা লেখা-পড়া জানতেন না তেমন। তাই আহমদ ছফার আলী কেনান পড়ার প্রশ্নই ওঠেনা। ২০০০ সালে তিনি কুকুরের কামড়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যান।
আ. "হাচেনা"
রাঙা চাচার ভালো নাম ছিল নিয়ামদ্দি।
তাঁর মুখে গুলে বাকাওয়ালীর কেচ্ছা শুনে কিঙবা "আখেরি জমানার" নবীর (সা:) বোরাকে চড়ে মে'রাজে যাবার মাজেজা শুনে আমাদের বড় হয়ে ওঠা।
দুধ-গুড় বর্ণের থিনথিনে পাতলা গড়নের লম্বা রাঙা চাচা শেখ হাসিনাকে শুধু "হাচেনা" বলতেন। বলার সময় আমরা তাঁর চোখে-মুখে অভূতপূর্ব এক আহ্লাদ ছড়িয়ে পড়তে দেখতাম। "অসমাপ্ত আত্মজীবনী"তে দেখতে পাই, বঙ্গবন্ধু হাসিনা বানানটি "হাচু" এবঙ "হাচিনা" ল্যাখেন!
এ কাকতালীয় প্রায়-সাদৃশ্যকে কি বলবেন?
পিতৃ-ভাবনার শ্বাশ্বত মিল?
ই. "শাজাহানরে, আম্লীক ক্ষমতায় আয়ছে"!
এই গল্পটুকুন টাঙ্গাইলের শোয়েব রানা ভাইয়ের মুখে শোনা। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগের কথা। সম্ভবত গ্রামের তৃণমূল আওয়ামী লীগ কর্মী শাজাহান অসুস্থ। নির্বাচন পর্যন্ত বাঁচবেন কিনা ভরসা নেই। তাই জেলা পর্যায়ের এক বড় নেতা তাঁকে দেখতে আসলে তিনি আর্তি করে বলেন: "আমি মারা গেলে, ভাই, আমার কবরে এসে বইলেন:
শাজাহানরে, আম্লীক ক্ষমতায় আয়ছে!"
জেনেছি ওই শাজাহান ২১ বছর পর (১৯৯৬) আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা দেখে যেতে পারেননি। এমনি করে সিলেটের সুরমা নদীতে নৌকা চালানো মুক্তিযোদ্ধা হাবিব মাঝি পকেটে পত্রিকায় ছাপা হওয়া বঙ্গবন্ধুর ছবির পত্রিকা কাটিঙস যত্ন করে মুড়িয়ে রাখেন আর মাঝে মাঝে বের করে দ্যাখেন।
পত্রিকায় পড়েছিলাম খবরটি, তাও বেশ কিছু বছর হলো। আর যে মাটিতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত ঝরেছে সেই মাটিতে আর জুতা/স্যান্ডেল না পরার গল্প হাজার মানুষের। খাবার সময় বঙ্গবন্ধুর হত্যার খবর শুনে হাত থেকে মাছের টুকরা পড়ে গিয়েছিলো নাম না জানা একজন মানুষের। হত্যাকারীদের ফাঁসি না হওয়া অবধি সেই লোক আর মাছ-মাংস খাননি।
কি অহিংস তিতিক্ষা!
২০১৬ সালে সিদ্দিক মিয়া নামের একজন বৃদ্ধ নৌকা বানিয়ে সেটি চালিয়ে ঢাকা চলে আসেন, কারণ ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধু তাঁর এলাকার কোনো সভায় গিয়ে তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন! এমনি গল্প বা স্মৃতির মোজাইক মেমোরি বহু মানুষের।
এই যে তিতিক্ষা, এই যে ভালবাসা, এই যে স্নেহ, এই যে আবেগ, এই যে দর্শন, এই যে উৎসর্গ -- এর কিছুই কোনো কিছুর বিনিময়ে শোধ হয়না। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তাই যখন একবার বলেছিলেন "আওয়ামী লীগ একটা অনুভূতির নাম" তখন তা অতিরঞ্জিত মনে হয়নি।
ঈ. বিনম্র সম্পৃক্তি
'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'র শুরুতে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত নোট থেকে নেয়া একটি ইংরেজি উদ্বৃতি আছে। উক্তিটিতে একটি শব্দ আছে -- 'abiding involvement'-- যার একটি য্যুৎসই অনুবাদ হতে পারে 'বিনম্র সম্পৃক্তি'।
বাঙালিয়ানায় বিনম্রভাবে মিশে থাকা। এই সম্পৃক্তির উৎস বঙ্গবন্ধুর জবানে "অবিনশ্বর ভালবাসা", যা তাঁর রাজনীতি ও বেঁচে থাকায় মানে এনে দ্যায়।
আদালতের সেরেস্তাদার শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা বানুর "খোকা" মুজিব তাই কী বিস্ময়ী-বিনয়ী ঢঙে আলগোছে তাঁদের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে থাকেন, মাওলানা ভাসানীকে কদমবুসি করেন বিনয়াবনত হয়ে, রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু হোসেন শহীদ সোহরাবার্দীর পাশে হাঁটেন শিক্ষকাবেশভারানতভাবে।
তাঁর পদপ্রান্তে অস্ত্র সমর্পণকারী মুক্তিসেনাকে তিনি কুর্ণিশ করেন, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাকে তিনি বুকে মাখেন, বীরাঙ্গনাদের বাবার ভূমিকা নেন তিনি, রঙপুরের দেয়াল লাফানি কিশোরীর মাথায় তিনি হাত বুলান পরম মমতায়, বৃদ্ধার রেখে দেয়া দুধের বাটি আর কয়েকটি আঁচলবাধা পয়সাপ্রসূত ভালবাসা থেকে তিনি বুঝে যান যে, মানুষের ভালবাসার সাথে ধোঁকা দেয়া তাঁর পক্ষে কোনদিন সম্ভব হবেনা।
জেলের গেটের (১৯৬২) দু'টি হলুদ পাখিকে তিনি চিনতে পারেন, জয়নুল আবেদীন-হাশেম খান-কামরুল হাসানকে ডেকে তিনি রক্তেভেজা সংবিধানের আল্পনা করান (১৯৭২), লাখো মানুষের সমাবেশে তিনি কাঁদেন, একটা বাক্যে তিনি হাজার বছরের বাঙালির ব্যাথাকে তুলে ধরেন:
"তেইশ বৎসরের ইতিহাস, মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস"।
মোহাম্মদ শাহ বাঙালির একটা লোকগানে দেখি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে য্যানো নদীর জলও ছলাৎ ছলাৎ করে উঠতো। নদীতে-নৌকায় ভাবুক মুখে প্রকৃতির আবহমানতায় তিনি মিশে যান, আব্বাসউদ্দীনের গানের সুরে সে নদী থমকে যায়।
এটাই বিনম্র সম্পৃক্তি --যার মাধ্যমে তিনি "বাঙলার আলপথ দিয়ে হেঁটে যান হাজার বছর ধরে, পলিমাটিতে পায়ের চিহ্ন ফেলে।"
উ. রক্তের ঋণ
সাতই মার্চের ভাষণে একটি উপেক্ষিত বাক্য আছে:
"যে রক্ত দিয়ে আপনারা একদিন আমাকে জেল থেকে বের করে নিয়ে এসেছিলেন, এই রেসকোর্স ময়দানে আমি বলেছিলাম, আমার রক্ত দিয়ে, আমি রক্তের ঋণ শোধ করবো। মনে আছে? আমি রক্ত দেবার জন্য প্রস্তুত।"
কথা রেখেছেন তিনি।
তাই ১৫ আগস্টের পরে শেখ মুজিবকে বাঙালির আর নতুন কিছু দেবার নেই। বরঙ তিনি যা দিয়ে গ্যাছেন, তা শোধ হবার নয়। তিনি দিয়ে গ্যাছেন একটি আলাদা পতাকা, বাঙালির নিজের করে একটি দেশ--বাঙালি জাতিসত্তার মর্যাদা। আর রেখে গ্যাছেন একটি সংবিধান যেখানে জ্বলজ্বল অক্ষরে ল্যাখা আছে:
"প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ।"
যে মানুষটিকে উচ্চাভিলাষী বলে খুন করেছিলাম আমরা বা বিভিন্ন যুক্তিতে খুন মেনে নিয়েছিলাম এই আমরা, তিনি সংবিধান নামক ইচ্ছাপত্রে লিখে গ্যাছেন:
"জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন।"
ঊ. 'জুলিয়াস সিজার' নাটকে সিজারের নির্মম হত্যাকান্ডের পর তাঁর বন্ধু আন্টোনিও রোমানদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তোমরা তোমাদের সিজারকে কেন ভালবাসতে তা কি ভুলে গেছ? যদি ভুলে গিয়ে থাকো তবে জেনে রাখো তিনি তাঁর শেষ উইলে রোমানদের জন্যে তাঁর সবকিছু দান করে গেছেন।
ঠিক বঙ্গবন্ধু তেমনি রেখে গেছেন তাঁর আদর্শ, রাষ্ট্রিক-চেতনা আর সোনার বাঙলা গড়ার স্বপ্ন। নতুন প্রজন্মের আন্টোনিও-দের দায়িত্ব হলো বাঙালিদের মনে করিয়ে দেয়া কেন তাঁরা একদিন বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছিলো।
কেন তারা তাঁকে ভালোবেসে 'বঙ্গবন্ধু' বলে স্বম্বোধন করতো। যে ভালোবাসাকে পুঁজি করে তিনি ফাঁসি কাষ্ঠে হাসতে হাসতে প্রাণ দিতে চেয়েছিলেন, একটি মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পন্ন রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। নিজের জীবন-যৌবন ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিলীন করে ১৪ বছর জেল-জুলুম-নির্যাতন ভোগ করেছিলেন।
বাঙালির 'মানুষ' হওয়ার গর্বে গর্বিত বাঙলার জুলিয়াস সিজার শেখ মুজিব যখন ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেটে নিজ বাড়ির সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েছিলেন, তাঁর সাথে জাতির ভাগ্যও কি লুটিয়ে পড়েনি সেদিন?
শেক্সপীয়র এর ভাষায়:
Great Ceasar fell
O what a fall was there,
My countrymen!
Then I, and you, and all of us fell down
Whilst bloody treason flourished over us.
তাঁকে বলা হয়েছে উচ্চাভিলাষী, একনায়ক।
অথচ গরীবের দুঃখে এই মানুষটি কাঁদতেন। আন্টোনিও রোমানদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন:
Did Caesar seem ambitious?
When that the poor have cried
Caesar hath wept
Ambition should be made of sterner staff!
জাতীয় শোক দিবসে (২০২৬) জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।
বিল্লাহ্ মাসুম,
অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়



