রাজধানীর মিরপুরে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী একটি মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য চিকিৎসালয় গুঁড়িয়ে ফেলা এবং ইসিবি চত্বর চত্বরে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের কার্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডবসহ দেশের নানা প্রান্তে ধারাবাহিক হামলা ও অবৈধ দখলের ঘটনায় তীব্র অপ্রস্তুত পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বর্তমান সরকার।
সরকার পরিচালনায় গুণগত সংস্কার ও ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তনে যখন শীর্ষ পর্যায় থেকে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে মাঠপর্যায়ের দলীয় নেতা-কর্মীদের নাম এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ায় ক্ষমতাসীন সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি) গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছে।
রাজনীতি ও পেশিশক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত স্থাবর সম্পত্তি, বসতবাড়ি ও সরকারি খাসজমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সহিংস আক্রমণের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দেশের সুশীল সমাজ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। একই সঙ্গে অনলাইন মাধ্যমেও চলছে তীব্র সমালোচনা, যার ফলে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে গভীর ভীতি ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি পৃথক ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক থানায় ইতোমধ্যে একাধিক মামলা রুজু হয়েছে, যার প্রেক্ষিতে বেশ কয়েকজন অভিযুক্তকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পলাতকদের আইনের আওতায় আনতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ বাহিনী।
দলের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও কঠোর হুঁশিয়ারি
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, শীর্ষ নেতৃত্বের কঠোর নির্দেশনার পর দলীয়ভাবে প্রতিটি সহিংস ও দখলদারির ঘটনার পৃথক তদন্ত চালানো হচ্ছে। এই অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে কারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে কিংবা সরাসরি মাঠে থেকে নেতৃত্ব জোগাচ্ছে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার কাজ চলছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রমাণ মিললে সাংগঠনিক শাস্তির পাশাপাশি অভিযুক্তদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সোপর্দ করা হবে। একইসঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে দেশজুড়ে সমন্বিত বিশেষ অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার সংক্রান্ত উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বিভিন্ন জনপদে সাম্প্রতিক অনাকাঙ্ক্ষিত আক্রমণ, ধ্বংসযজ্ঞ ও জবরদখলের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত মর্মাহত ও অস্বস্তিতে রয়েছে। কোনো অপরাধীকে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ে ছাড় দেওয়া হবে না এবং পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ধ্বংস ও স্টুডিও ভাঙচুর
সবচেয়ে বেশি প্রতিকূলতা তৈরি করেছে মিরপুর এলাকায় অবস্থিত প্রাচীন 'রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার' নামের চিকিৎসাকেন্দ্রে গভীর রাতের ধ্বংসযজ্ঞ। স্থানীয় একটি বিশেষ প্রভাবক মহলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ যাচাই করছে তদন্তকারী দল। ইতোমধ্যে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও শ্রমমন্ত্রীসহ স্থানীয় শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা দুর্ঘটনাস্থল সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং দোষীদের কঠোর সাজার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সেখানে চিকিৎসা ও প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগের কার্যক্রম পুনরায় সচল রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির পুনঃনির্মাণ কাজও প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের 'ব্রাউনফিশ স্টুডিও'-তে ঢুকে হামলা, আসবাবপত্র বিনষ্ট ও লুটপাটের ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে প্রশাসন। উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় নিরাপত্তা বাহিনী অকুস্থলে পৌঁছে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। একইসঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকা এবং আদাবরের শেখেরটেকে ভূসম্পত্তি ও বাসাবাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রেক্ষিতে একাধিক ব্যক্তিকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
মিরপুরের ঘটনায় দলীয় সংশ্লিষ্টতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের জমায়েত করা, দেশীয় অস্ত্রের জোগান দেওয়া এবং ভারী খননযন্ত্র (এক্সক্যাভেটর) সরবরাহের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে। চিকিৎসালয়টি সম্পূর্ণ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার পরপরই সেখানে 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড' শিরোনামে নতুন মালিকানার ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এই সংগঠনের নেপথ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠদের সম্পৃক্ততার আভাস পাওয়া গেলেও শুরু থেকেই তিনি নিজে এই নাশকতার সাথে কোনো ধরনের সংযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
আলোচিত এই অপরাধযজ্ঞে এখন পর্যন্ত দশ জনের অধিক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনাস্থলে সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা ও পেশাগত অবহেলার প্রাথমিক দায়ে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে, হামলার আগের রাতে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক নেতা আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত স্থানীয় নেতা হানিফ মিয়ার ব্যক্তিগত কার্যালয় প্রাঙ্গণে হামলাকারীরা সংঘবদ্ধ হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হয়। হামলার সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক কর্মকর্তা মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ কয়েকজন একটি সাদা রঙের গাড়িতে চড়ে আশপাশের পথ দিয়ে সার্বিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। মাঠপর্যায়ে তাণ্ডবের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রদলের আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ ও স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপি নেতা মো. ইলিয়াস, আর খননযন্ত্রটি নিয়ে আসার কাজটি করেন ছাত্রদলের সাবেক নেতা মারুফ।
নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ ও পুলিশের অবস্থান
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং দখলদারিত্বের এই বিপজ্জনক প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের লাগামহীন পরিস্থিতি সরকারের সার্বিক সুনামের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে। তবে প্রশাসনের শীর্ষ মহল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো রাজনৈতিক চাপ তোয়াক্কা না করে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনার কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের নিয়মিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় বাহিনীর প্রধান মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির মাঠপর্যায়ের সমস্ত কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যে, সমাজের যেকোনো ধরনের চাঁদাবাজ, দুষ্কৃতকারী বা মাদক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আইনের চোখে অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে একজন অপরাধী।
এদিকে সুলতানা কামাল, আনু মুহাম্মদ, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সারা হোসেন ও শহিদুল আলমসহ দেশের আটত্রিশ জন বরেণ্য নাগরিক এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই অরাজকতায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা সতর্ক করেছেন যে, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এর সঙ্গে কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, পূর্ববর্তী সরকারের চিহ্নিত দোসর এবং প্রশাসনের ভেতরের কতিপয় উপাদানের যৌথ কারসাজি থাকতে পারে। তাই দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষক ও দেশি-বিদেশি মদদদাতাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তারা।