শনিবার, 17 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল উদ্বোধন আগামী সপ্তাহে

বিমানবন্দর চত্বরে উড়োজাহাজ ও ভবনের মধ্যে যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে গলফ কার্ট ব্যবহার করা হবে। অভ্যন্তরীণ রুটের কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার পরপরই আগামী মাসে আন্তর্জাতিক পরিসরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।

কক্সবাজার বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল উদ্বোধন আগামী সপ্তাহে
দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নবনির্মিত বিমানবন্দর টার্মিনাল ভবন আগামী সপ্তাহ থেকেই অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীদের সেবাদানে উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। অক্টোবর মাসে বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কার্যক্রম উদ্বোধনের আগে এই পদক্ষেপকে পর্যটন নগরীর আকাশপথকে বৈশ্বিক মানে রূপান্তরের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন এই ভবনের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রুটের সকল যাত্রীর আগমন ও প্রস্থানের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে চূড়ান্ত কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনের পর তিনি নিশ্চিত করেন, সংশ্লিষ্ট সব বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা ইতোমধ্যে তাদের যাত্রীসেবা সংক্রান্ত সব লজিস্টিকস নতুন ভবনে স্থানান্তরের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

তিনি আরও জানান, বিমানবন্দর চত্বরে উড়োজাহাজ ও ভবনের মধ্যে যাত্রী আনা-নেওয়ার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে গলফ কার্ট ব্যবহার করা হবে। অভ্যন্তরীণ রুটের কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার পরপরই আগামী মাসে আন্তর্জাতিক পরিসরে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে।

বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা নভোএয়ারের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ জানান, নতুন ব্যবস্থাপনায় যাত্রীদের সেবা পৌঁছে দিতে তাদের সব ধরনের কারিগরি ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং পরীক্ষামূলক পরিচালনাও সফল হয়েছে। বিশেষ করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধার্থে গলফ কার্ট মোতায়েনসহ সার্বিক সমন্বয় নিশ্চিত করা হয়েছে।

আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ ও সমুদ্রের জলভাগ ভরাট করে রানওয়ে সম্প্রসারণের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর আগামী মাসেই কক্সবাজারকে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষণার চূড়ান্ত তোড়জোড় চালাচ্ছে সরকার। এর আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত আশা প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি একাধিক বিদেশি এয়ারলাইনসও সরাসরি এই সমুদ্রশহরে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হলে টার্মিনাল পরিচালনায় একটি সমন্বিত বা মিশ্র পদ্ধতি কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছেন বেবিচকের পরিচালনা ও পরিকল্পনা বিভাগের সদস্য এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিদেশগামী এবং বিদেশ থেকে আসা উভয় অংশের যাত্রীরাই আধুনিক নতুন টার্মিনালটি পুরোপুরি ব্যবহার করবেন। অন্যদিকে দেশের ভেতরের রুটে পৌঁছানো যাত্রীরা অবস্থান করবেন বর্তমান ভবনে এবং ঢাকা কিংবা অন্যান্য রুটের বহির্গামী যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে টিকিট যাচাই ও প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষার সুবিধার্থে পুরোনো ভবনে প্রবেশ করবেন।

মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় বেবিচকের বাস্তবায়িত এই বৃহত্তর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে বোয়িংয়ের মতো বৃহৎ পরিসরের ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ অবতরণের সক্ষমতা তৈরি করা। বর্তমানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী বিমান নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে। অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভ্রমণপিপাসুদের সরাসরি এই সৈকত শহরে আনার জন্য দুটি উন্নয়ন প্রকল্প ও একটি বিশেষায়িত কারিগরি প্রকল্প সফলভাবে শেষ করেছে কর্তৃপক্ষ।

প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের এই আন্তর্জাতিক টার্মিনালটি নির্মাণে অনুমোদিত বরাদ্দ ছিল আনুমানিক ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। নবনির্মিত ভবনে রয়েছে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষম ডিপার্চার লাউঞ্জ, শুল্কমুক্ত বিপণি, আধুনিক বোর্ডিং ব্রিজ, চলন্ত সিঁড়ি, লিফট, স্বয়ংক্রিয় লাগেজ বেল্ট এবং সুপরিসর চেক-ইন ডেস্ক। বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য চারটি ও আগমনকারীদের জন্য ছয়টি আলাদা ইমিগ্রেশন ডেস্ক বসানো হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মালামাল খালাসে দুটি বিশেষ কনভেয়ার বেল্টের পাশাপাশি সার্বিক নিরাপত্তা ও দিকনির্দেশনায় তথ্য প্রদর্শন পর্দা, গণবিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থা, সিসিটিভি এবং ভারী মালামাল তল্লাশির স্ক্যানার বসানো হয়েছে।

এই উন্নয়ন কার্যক্রমের ফলে বিমানবন্দরটির বাৎসরিক যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা আগের ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে একলাফে বেড়ে ১৮ লাখে পৌঁছাবে। এছাড়া দুটি বড় মাপের উড়োজাহাজ ও তিনটি মাঝারি ড্যাশ-৮ বিমান রাখার উপযোগী ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটার আয়তনের আধুনিক অ্যাপ্রন এবং দুটি ট্যাক্সিওয়ের নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে। গাড়ি ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে ৩৫টি বিশেষ ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ যানের সুনির্দিষ্ট পার্কিং এলাকা, অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। আন্তর্জাতিক সব মানদণ্ড যথাযথভাবে পূরণ করায় বিমানবন্দরটি বৈশ্বিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা বা আইসিএও-এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।

এই রূপান্তরের অন্যতম সেরা অর্জন হলো এর রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুটে উন্নীত করা, যার সুবাদে এটি বর্তমানে বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়ে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। অতিরিক্ত এই ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে তৈরির উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করতে হয়েছে। এর ফলে বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর কিংবা বোয়িং ৭৪৭-৪০০ মডেলের মতো সম্পূর্ণ ভারী ও সুপরিসর বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ অনায়াসে এই রানওয়েতে সরাসরি অবতরণ করতে পারবে।

রানওয়ে সম্প্রসারণের অনুমোদিত বরাদ্দ ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক নির্মাণব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকায়, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে চীনা যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি। সমুদ্রের দিকে ২ হাজার ২০০ ফুট প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিরাপদ উড্ডয়ন নিশ্চিতে অত্যাধুনিক ক্যাটাগরি-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং স্থাপন করা হয়েছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে অবকাঠামো রক্ষায় ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র প্রতিরক্ষা বাঁধ, চারপাশের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেড়া, নিয়মিত টহল রাস্তা এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটারের সুপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

সরকারের দৃঢ় বিশ্বাস, সরাসরি বৈশ্বিক যোগাযোগ স্থাপিত হলে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ব্যাপক সংখ্যায় আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ঘটবে, যা স্থানীয় হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট নানামুখী খাতে বিপুল বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের দ্বার খুলে দেবে।