বাংলাদেশে লাতিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যকার তীব্র উন্মাদনা এবং মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঝেমধ্যেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও মারামারিতে রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইতিমধ্যে সমর্থক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে এবং এর ফলে মারামারি ও আহতের ঘটনাও ঘটছে।
ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক কোনো প্রত্যক্ষ সংযোগ না থাকা সত্ত্বেও শত শত কিলোমিটার দূরের দুটি দেশের ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশিদের এই উগ্র সমর্থক হয়ে ওঠার পেছনে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে এই অঞ্চলে প্রথম ফুটবলের প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ সমাজ অনুপ্রেরণার খোঁজে ব্রাজিলের ফুটবল ও কিংবদন্তি পেলের মাঝে এক পরম নায়কের সন্ধান পায়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হতে থাকে।
এরপর আশির দশকে বাংলাদেশে রঙিন টেলিভিশনের যুগে প্রবেশের সাথে সাথে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুকরী ফুটবল আপামর মানুষের মন জয় করে নেয়। বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক গোলটি বাংলাদেশিদের কাছে একটি প্রতীকী বিজয় হিসেবে দাগ কেটেছিল, যা রাতারাতি আর্জেন্টিনা সমর্থকের এক বিশাল চারণভূমি তৈরি করে। বর্তমানে সেই ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া স্থানে লিওনেল মেসি এবং ব্রাজিলের পক্ষে নেইমারকে কেন্দ্র করে এই আবেগ ও উন্মাদনা নতুন রূপ নিয়েছে।
তবে ফুটবলের প্রতি এই অন্ধ ভালোবাসা ও চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বিশাল পতাকা টাঙানোর প্রতিযোগিতা, জার্সি কেনা এবং একে অপরকে সামাজিক ও মানসিকভাবে টেক্কা দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত পারস্পরিক দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। বিগত ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ চলাকালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন ফুটবল ভক্তের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি অতীতে বৈদ্যুতিক লাইনে অসাবধানতাবশত প্রিয় দলের পতাকা ওড়াতে গিয়েও অনেক কিশোর ও তরুণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে।
চলতি জুনের শুরুর দিকেও হবিগঞ্জের কাশীপুর গ্রামে একটি স্থানীয় ম্যাচকে কেন্দ্র করে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে অন্তত অর্ধশত মানুষ গুরুতর আহত হন। বিশ্বকাপের এই উন্মাদনা একদিকে যেমন বৈশ্বিক স্তরে আর্জেন্টিনা ও ফিফার কাছ থেকে গভীর স্বীকৃতি ও প্রশংসা কুড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনই স্থানীয় পর্যায়ে এটি মাঝেমধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের চরম বৈরী প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, যা অনেক সময় রূপ নিচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতায়।