মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার সার্বিক প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রধান তেল সূচক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি শত ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করেছে। মে মাসের পর এই প্রথম তেলের দর এমন উচ্চতায় পৌঁছাল, যার মূল কারণ সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা।
যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরানি ভূখণ্ডে সামরিক চাপ বাড়ানোর কারণে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহ তীব্রতর রূপ নেয়। গত বৃহস্পতিবার একদিনেই ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য ছয় শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে তেল পরিবহনে যুক্ত বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ চালানোয় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনকি সৌদি আরব হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেলের চালান পাঠানোর জন্য যেসব পথ ব্যবহার করত, সেগুলোও বর্তমানে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
এদিকে কেবল তেল নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামেও ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের জ্বালানি বাজারে গত জুনের শেষদিকে বেঞ্চমার্ক গ্যাসের দর যেখানে ৯৮ পেন্সের মতো ছিল, তা বর্তমানে থার্মপ্রতি প্রায় দেড়শো পেন্স ছুঁয়েছে।
এর আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সাময়িক উত্তেজনা প্রশমনের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দর কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছিল, যা ফেব্রুয়ারির শেষের দিকের সামরিক অভিযানের পূর্বের জায়গায় নেমে এসেছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির ইতি ঘটায় বাজার আবারও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান মার্কো রুবিও মন্তব্য করেছেন যে, তেহরান সরকার কোনো ধরনের কূটনৈতিক সমাধানে আসতে এখনো রাজি নয়।
আর্থিক বিশ্লেষণকারীরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে সারা বিশ্বে আবারো নতুন করে মূল্যস্ফীতি তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। জ্বালানি তেলের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি পরিবহন খাত প্রভাবিত হয়, যার রেশ ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর সামগ্রিক উৎপাদন ও বাজারে সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ে।
এর বাস্তব প্রভাব দেখা যাচ্ছে উন্নত বিশ্বে। গত আড়াই সপ্তাহে ব্রিটেনে পেট্রোলের দর লিটারপ্রতি প্রায় পাঁচ পেন্স বেড়ে প্রায় ১.৫৬ পাউন্ড দাঁড়িয়েছে, আর ডিজেলের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক ১.৭২ পাউন্ড অতিক্রম করেছে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় মূল্য আাবার চার ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এই উদ্ভূত সংকটের মধ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা কেভিন ওয়ার্শ দেশটির আইনসভায় সাফ জানিয়েছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘ স্থায়ী হতে দেওয়া হবে না। বিদ্যমান সংকটে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা তৈরি হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর ভূমিকা পালন করবে। দেশের শীর্ষ প্রশাসনিক মহল সুদের হার কমানোর পক্ষে মতামত ব্যক্ত করলেও, ফেডারেল রিজার্ভ তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকে পলিসি রেট সাড়ে তিন থেকে পৌনে চার শতাংশের মাঝামাঝি অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে।