সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত জেলাগুলোর ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা বর্তমানে পানির নিচে রয়েছে। এর ফলে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। এবারের দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের শিকার হয়েছে কক্সবাজার জেলা। সেখানে পাহাড় ধস এবং বন্যার পানিতে ডুবে সর্বোচ্চ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা। এ ছাড়া জেলাটিতে আরও ২৪ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে বিভাগীয় অঞ্চল চট্টগ্রামে দেয়াল ধসে ও বন্যার পানিতে ভেসে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। পার্বত্য জেলা বান্দরবানে পাহাড় ধস ও ঢলের পানিতে ভেসে মারা গেছেন ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা মৌলভীবাজারেও বন্যার কারণে ১ জনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে মন্ত্রণালয়।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জনভোগান্তি ও ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে চট্টগ্রাম জেলা সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলায় আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ জলাবদ্ধতার কারণে ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন বাসিন্দা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এবং সেখানে পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি। ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কক্সবাজার, যেখানে ১০টি উপজেলার ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন বাসিন্দা বন্যার কবলে পড়েছেন এবং ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার জলমগ্ন রয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে ২৭ হাজার ২২০ জন, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৫২৪ জন, বান্দরবানে ৮ হাজার ৩৫০ জন, মৌলভীবাজারে ৩৮ Horse ১৭২ জন এবং হবিগঞ্জে ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হঠাৎ চলে আসা পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় জীবন বাঁচাতে বিপন্ন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন। দুর্গতদের সাময়িক আবাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসন ইতিমধ্যে ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু বাসিন্দা এখনও জলমগ্ন নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে আসতে রাজি হননি। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থান নেওয়া মানুষের মাঝে শুকনো খাবার ও পানের অযোগ্য পানির কারণে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারি পর্যায়ে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত ৭ জুলাই দেশের সব জেলার প্রশাসকদের অনুকূলে মোট ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দিয়েছে, যার মধ্যে বন্যাকবলিত এই সাতটি জেলাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দকৃত ত্রাণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে চট্টগ্রাম, সেখানে ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা নগদ দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া পার্বত্য তিন জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের প্রতিটিতে ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজারে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্গত এলাকায় জরুরি সামগ্রী বিতরণ শুরু হলেও অনেক অঞ্চলের গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় সাহায্য পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষ এখন কেবল পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ কর্মসূচি ও জরুরি সাড়াদান সমন্বয় অধিশাখার যুগ্মসচিব সেখ ফরিদ আহমেদ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, উপদ্রুত জেলাগুলোর সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠ পর্যায়ে সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জেলা প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের যৌথ প্রচেষ্টায় এই সংকট উত্তরণের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।